সামুদ্রিক শৈবাল বা ফাইটোপ্লাংকটন (উদ্ভিদকণা) নিয়ে গবেষণা করে ৫ ধরণের প্রভাবক পেয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক; প্রভাবকগুলো সামুদ্রিক শৈবালকে নানাদিক থেকে নিয়ন্ত্রণ করে বলে জানান তিনি।
এছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণায়ন লাঘবে এই শৈবাল ‘বাফার বা সেইফটি শিল্ড’ হিসেবে কাজ করছে বলে জানান এ গবেষক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহকারী অধ্যাপক ড. সুব্রত সরকারের গবেষণায় বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
‘বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের সামদ্রিক শৈবালের প্রভাবক সমূহ’ শিরোনামে তার এই গবেষণা প্রবন্ধটি সম্প্রতি নেদারল্যান্ডের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওশনোগ্রাফির গবেষণা জার্নাল ‘জার্নাল অব সি রিসার্চে ‘এলসিভিআর’ কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। শাবির গবেষণা কেন্দ্রের অর্থায়নে তিনি এ গবেষণাটি সম্পন্ন করেছেন।
এছাড়া গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ চলতি বছরের মে মাসে তাকে ভিসি অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করেছেন।
গবেষক সুব্রত সরকার সিলেট ভিউকে বলেন, শৈবাল নিয়ে গবেষণায় ৫টি প্রভাবক তিনি পেয়েছেন। প্রথমটি হচ্ছে পুষ্টিউপাদান; যার মধ্যে প্রধান তিনটি উপাদান হচ্ছে ‘সিলিকেট, নাইট্রেট, ফসফেট’। আমরা যেমন ভাত খাই ক্ষুধা মেটানোর জন্য শৈবালের ক্ষেত্রে এগুলোও সেইরকম ভূমিকা রাখছে; শৈবাল সেগুলো খেয়ে বেড়ে উঠে।
দ্বিতীয় প্রভাবকটি হচ্ছে ‘টার্বিডিটি বা পলি’। পানিতে এর পরিমাণে খুব বেশি বাড়লে অর্থাৎ পানির উপর স্তর পলি দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে গেলে সূর্যের আলো উদ্ভিদকণার কাছে পৌঁছাতে পারেনা। ফলে খাদ্য উৎপাদন বা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে শৈবাল কমে যেতে পারে।
তৃতীয় প্রভাবক হচ্ছে ‘লবনাক্ততা’ এবং চতুর্থটি ‘পানির তাপমাত্রা’। এ দুটির মাত্রাতিরিক্তি বৃদ্ধি শৈবালের অস্তিত্বের জন্য ক্ষতিকর।
পরের প্রভাকটি হচ্ছে খাদক; যারা এটাকে খায়। আর প্রধান খাদক হচ্ছে মাছ। এর মধ্যে শৈবাল ও মাছের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা জরুরি।
সমুদ্্ের এই শৈবালকে কারা নিয়ন্ত্রন করে? পরিবেশের কোন কোন উপাদান এটাকে প্রভাবিত করে? বিষয়টি দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শৈবালের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করেছেন এই গবেষক। এর মধ্যে পটুয়াখালী, ভোলা, সুন্দরবন, রাজশাহী, নোয়াখালীসহ উপকূলবর্তী অঞ্চল থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন তিনি। ওই সব অঞ্চল থেকে পানিও সংগ্রহ করেছেন; পানিতে থাকা কোন কোন ফ্যাক্টরগুলো উদ্ভিদকণা বা শৈবালকে প্রভাবিত করে এই দিকটিও তার গবেষণায় উঠে এসেছে।
পানিতে থাকা পুষ্টিউপাদান যদি যথার্থ পরিমাণ থাকে বা বেশি থাকে তাহলে এই ফাইটোপ্লাংকটন বৃদ্ধি পায় বলে জানান সুব্রত সরকার।
‘পুষ্টি উপাদানগুলো বেশিরভাগই মিলে সুন্দরবন অঞ্চলে’ উল্লেখ করে সমুদ্র বিজ্ঞানের এই শিক্ষক বলেন, ‘‘সুন্দরবনের গাছ গুলো থেকে প্রতিনিয়তই পাতা ঝরছে। যে পাতাগুলো ঝড়ে পড়ছে, সেগুলো জোয়ারের পানির মাধ্যমে মূল পানিতে মিশে পঁচে যায়। পঁচার একপর্যায়ে পানিতে পুষ্টি উপাদানের সৃষ্টি হয়।’’
‘‘নদীর মোহনা গুলোতে এগুলো বেশি থাকে; তাই উদ্ভিদকণা সেখানে বেশি হয় এবং সেখানে মাছসহ বিভিন্ন জলজ জীব থাকায় একটি অসাধারণ বৈচিত্রও দেখা যায়।’’
গবেষক জানান, নদীর মধ্যে দিয়ে সমতল বা পাহাড় থেকে মোহনায় বা সমুদ্রে যে নির্গত পদার্থগুলো আসতো, নদীর উপর বাঁধ দেওয়ার ফলে সেগুলোর আসা এখন কমে গেছে। যে ঢলটিও নামতো তাও কমে গেছে। এর অভাবে উপকূল এলাকায় ও মোহনায় লবনাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। এটি বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
‘‘ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা প্যারা বনগুলো নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অতিরিক্ত লবনাক্ততা সহ্য করতে পারে। এখন সারাদিন যদি তা লবণপানি দিয়ে ঢাকা থাকে তখন এটি ভীষণ ক্ষতিকর। নদী দিয়ে যখন সমতল বা পাহাড়ি ভূমি থেকে পরিষ্কার পানিটা আসছে না তখন লবনাক্ত পানির পরিমাণটা উপকূলে দিন দিন বাড়ছে। এসকল এলাকার কৃষিজমিতে লবনাক্ততার পরিমাণও বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।’’
এদিকে পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ। এর কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রার সঙ্গে সঙ্গে মেরু অঞ্চলে বরফ গলা শুরু হয়েছে। এতে সমুদ্রে পানির স্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের দেশগুলো প্লাবিত হওয়া শুরু করেছে। ‘এক্ষেত্রে শৈবাল বা ফাইটোপ্লাংকটন (উদ্ভিদকণা) কি ভূমিকা রাখতে পারে?’ গবেষণার অন্যতম একটি দিক এ বিষয়টিও ছিল বলে জানান গবেষক সুব্রত সরকার।
‘‘আমরা জানি যে, পৃথিবীর চারভাগের মধ্যে তিনভাগই সমুদ্র। এখন শৈবাল বা ফাইটোপ্লাংকটনও উদ্ভিদ। এটি সমুদ্রে বেড়ে ওঠে। এরাও কার্বন্ ডাই অক্সাইড নেয়্। তাদের সালেকসংশ্লেষন হয়। শৈবালেরা এই যে কার্বন ডাই অক্সাইড নিচ্ছে, এর মাধ্যমে এটি বৈশ্বিক জলবায়ুগত পরিবর্তনের বা উষ্ণায়ন লাঘবে ‘বাফার বা সেইফটি শিল্ড’ হিসেবে কাজ করছে।’’
শৈবাল বা উদ্ভিদকণা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কি ভূমিকা রাখছে জানতে চাইলে এই গবেষক বলেন, ‘‘বাংলাদেশের বøু-ইকোনমির অনেকগুলো উপাদান আছে। এর মধ্যে রয়েছে মাছ, সামুদ্রিক ঝিনুকসহ অন্যান্য উপাদান। বিদেশে এদের প্রচুর চাহিদা। আমাদের অর্থনৈতিক খাতের গুরু জায়গা জুড়ে রয়েছে রয়েছে এসব উপাদান। এগুলো রপ্তানি করে বিশাল একটি পরিমাণ অর্থ আয় করে বাংলাদেশ।’’
‘‘উপাদানগুলো কিভাবে সমুদ্রে চাষ করতে হয়, আমাদের কাছে সেই তথ্য না থাকলে কিভাবে চাষ করবো ? চাষ করার ফলে এটি কি ধরণের প্রভাবের সম্মুখীন হবে? এগুলোও তখন জানা জরুরি হয়ে পড়ে।’’
গবেষক সুব্রত সরকার বলেন, ‘‘প্রত্যেকটি জিনিসের একটি অপটিমাম শর্ত আছে। যেমন বøু-ইকোনমির উপাদান গুলোর প্রধান উপাদান হল মাছ। এখন এই শেবাল যদি না থাকে তাহলে মাছ বাঁচতে পারবে না। এখন যদি আমরা মাছ চাষ করতে চাই তাহলে আমাদের দেখতে হবে পানির গুনাগুন এবং তার খাবার এই শৈবালকে। এই শৈবালে পুষ্টিগুনও খুঁজতে হবে। তখনই সেখানে মাছ চাষ করা যাবে।’’
তাই বøু-ইকোনমির ক্ষেত্রে এবং বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনে বিবেচনায় শৈবাল বা ফাইটোপ্লাংকটন অন্যতম ভূমিকা রাখছে বলে তিনি জানান।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/নোমান/এসডি-০১




