হাওরে গভীরতা কমে গেছে, জলাধারগুলোয় থৈ থৈ পানিও বছরের বেশিরভাগ সময় থাকে না। নদীর নাব্যও কমে গেছে। নদীর বাঁকে বাঁকে থাকা গভীর ডুয়ারগুলো ভরাট হয়ে আছে। এজন্য অনেক প্রজাতির, বিশেষ করে গভীর পানির মাছও সংকটাপন্ন অবস্থায় হাওরাঞ্চলে।

সিলেটের চার জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসখ্য হাওর, বিল, খাল, জলমহাল। অথচ এগুলোতে এখন আর এগের মত মাছ পাওয়া যায় না।


মৎস্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৬০ প্রজাতির মাছ হারিয়ে যেতে বসেছে। যার মধ্যে অনেক মাছ আছে যা সম্পূর্ন বিলুপ্ত হয়ে গেছে যা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব না।

স্থানীয় মৎস্যজীবীরা জানান, বিল-জলাশয় শুকিয়ে মাছ ধরা, অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার, অবৈধ ঘন জাল এবং কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ শিকার, পোনা ও মা মাছ নিধন, নদী ও হাওর ভরাট হয়ে যাওয়া, অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ, ঢলের পানিতে মাটি ভরাট হওয়া, পানির তলদেশে থাকা পুরোনো গাছগাছালি উত্তোলন করে মাছের অভয়াশ্রম ভেঙে দেওয়াসহ নানা কারণে মাছের নিরাপদ আবাসস্থল বা ডিম পাড়ার স্থান কমে গেছে। এ কারণে ধীরে ধীরে  অনেক প্রজাতির সুস্বাদু ও দামি মাছ বিলুপ্ত হতে চলেছে। তাই মানুষের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে পুকুরে চাষ করা বিদেশি প্রজাতি মাছের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে ।

মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়- জেলায় বিলুপ্ত হওয়া সুস্বাদু মাছের মধ্যে রয়েছে একঠুটি কাকিলা, মধু পাবদা, ভট শিঙি, মুরি বাচা, পাতাসি, রাম টেংরা, আর্মি টেংরা, রিটা, গুজি আইড়, দারকিনা, ঢেলা, জেব্রা, কেচি চেলা, ছেবলি, ঘোড়া চেলা, নারকেলি চেলা, বাগরা বরালি, আংরা রুই, এরিজা রুই, চ্যাগুনি, কুরসা, লাসু রুই, কালা বাটা, নানিদ, ঘোড়ামুখো, মহাশোল, লোহাচাটা রানী, বউ মাছ, গজার, বাঘাইড় ইত্যাদি।

কাজিরবাজার মাছ ব্যবসায়ী কালা মিয়া বলেন, নদীর অনেক মাছ এখন আর দেখাযায় না। অনেক খাল বিল ভরাট হওয়ায় মাছ তার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ডিম পারতে পারছে না। নদীতে মাছ কম থাকায় এখন বিদেশি মাছ বাজার দখল করে নিয়েছে।   তাছাড়া অকাল বন্যা প্রতিরোধে অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধের কারণেও মাছের বংশ বিস্তার কমে যাচ্ছে। 

আলাউদ্দিন নামের এক জেলে বলেন, মাছের চলাচল এবং ডিম পাড়ার স্থানও নষ্ট হয়ে গেছে। মাছের চলার পথে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। ডিম পাড়ার স্থান নেই।  এছাড়া নদীতে বিশ দিয়ে আনেকে মাছ ধরেন, যার ফলে মাছ আর আগের মতো জালে ধরা পরে না। মিঠাপানির মাছের বিলুপ্তি ঠেকাতে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সিলেট বিভাগীয় মৎস্য অফিসের উপ-পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, মূলত প্রাকৃতিক কারনে অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছ। এছাড়া মানবসৃষ্ট কারনও রয়েছে। নদী-খাল-বিলগুলোতে এখন পানি থাকছে না, পলি পরে ভরাট হয়েযাচ্ছ। খরস্রোতা নদীগুলোর নব্য হারানোয় প্রাকৃতিক জলাধারের অনেক মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে। এছাড়া হাওরে অপ্রয়োজনীয় ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, কীটনাশক ও অবৈধ জালের ব্যবহার, হাওর বা বিল শুকিয়ে নির্বিচারে মাছ ধরা হচ্ছে। যার ফলে মাছ তারা স্বাভাবিক প্রজনন করতে পারছে না।

তিনি আরো বলেন, মানুষ এখন যেসব জাল ব্যবহার করে সেগুলো অনেক উন্নত। এছাড়া অনেকেই মাছ ধরতে বিশ ব্যবহার করেন। এগুলো মাছের ব্যপক ক্ষতি করে একই সাথে খাল-বিলের পানিও নষ্ট করে। এগুলো যারা করে তাদের আইনের আওতায় আনা দরকার।  

আনোয়ার হোসেন বলেন, তবে মাছ স্বাভাবিক প্রজনের জন্য সরকার কাজ করছে। সমুদ্রে ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছিল, যার ফল পেয়েছি আমরা। আবার ঝাটকার জন্য আট মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকে। যার ফলে ইলিশও বেড়েছে। একই ভাবে সিলেটেও একমাস মাছ ধরা বন্ধের পরিকল্পনা হেতে নেয়া হচ্ছে। এমনটি হলে হাওরের মাছ কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া বিভিন্ন জলাশয়ে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হচ্ছে। জেলেদের সমিতি করতে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে, যাতে তারা নিয়মনিতি মেনে মাছ ধরতে পারেন। এটি একটি কঠিন বিষয়, সময় লাগবে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবছর অনেক বেশি মাছ হয়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।


সিলেটভিউ২৪ডটকম / নাজাত / ডি.আর