১৫ ডিসেম্বর, বিকাল ৪টা। ঢাকা থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সিলেটে বেড়াতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী শাহাদাত হোসেন সিলেটের লাক্কাতুড়া বাগানে ঢুকতে গেলে চা শ্রমিক কয়েকজন তরুণ-যুবকের বাধার মুখে পড়েন। শাহাদাতকে তারা বলেন- বাগানে ঢুকতে গেলে তাদের মধ্য থেকে একজনকে ‘গাইড হিসেবে’ সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। অনথায় তাদের টাকা দিতে হবে।

এসময় শাহাদাত পরিবারের নারী-শিশুসহ ৫-৬ জন সদস্য নিয়ে পড়েন বিপাকে। কিছু সময় চাঁদা দাবি করা তরুণ-যুবকের সঙ্গে বাক-বিতন্ডা করে পরে বাধ্য হয়ে তাদের টাকা দিয়েই ঢুকেন চা বাগানে তিনি। 


সিলেট মহানগর এলাকার প্রত্যেকটি চা বাগানের প্রতিদিনের দৃশ্য এটি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রতিটি চা বাগানের প্রবেশমুখে এভাবেই দাঁড়িয়ে বেড়াতে আসা নারী-পুরুষদের কাছে চাঁদাবাজি করেন কতিপয় চা শ্রমিক যুবক ও তরুণ। দাবি অনুযায়ী চাঁদা না দিলে বেড়াতে আসা লোকজনকে তাদের হাতে হতে হয় লাঞ্ছনার শিকার। অনেক সময় ঘটে হাতাহাতির ঘটনাও। 

এছাড়াও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে- মহানগর এলাকার চা বাগানগুলোর ভেতরে আড়ালমতো স্থানে খোপ বা খুপড়ি বানিয়ে রাখা হয়েছে। বাগানে বেড়াতে যাওয়া বিভিণ্ন তরুণ-তরুণী ও যুবক-যুবতীরা এসব খোপ বা খুপড়িতে লিপ্ত হন অসামাজিক কাজে। এদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অবৈধ কাজের সুযোগ করে দেন এসব চা শ্রমিক তরুণ ও যুবকরা। 

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বাগানকেন্দ্রিক এসব চাঁদাবাজি ও অপরাধ ঘটানো চা শ্রমিক তরুণ-যুবকদের শেল্টার দেন বাগানের  ম্যানেজাররা। এসব  শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকার ভাগ নেন তারা।

সিলেট ট্যুরিজম ক্লাব ও পর্যটন সমিতির সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন এ বিষয়ে সিলেটভিউ-কে বলেন- চা বাগানগুলোতে আসলে কেউ ঢুকার নিয়ম নেই। এগুলো মালিকদের সীমাবদ্ধ এলাকা। তবে সিলেট যেহেতু পর্যটন-নগর হিসেবে পরিচিত, তাই দেশি-বিদেশি পর্যটকরা বেড়াতে এসে সিলেটের নয়নাভিরাম চা বাগানগুলো না দেখে যান না। তারা অত্যন্ত আগ্রহভরে সিলেটে চা বাগানগুলো দেখতে চান। এরই সুযোগে চা শ্রমিকদের মধ্য থেকে কতিপয় তরুণ ও যুবক পর্যটক বা বেড়াতে আসা লোকজনের কাছ থেকে বাগানে ঢুকতে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে টাকা আদায় করে। 

তিনি বলেন- সিলেটের চা বাগানগুলো যেহেতু পর্যটকদের টানে, তাই আমরা ইতিপূর্বে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে একটি লিখিত আবেদন করেছিলাম। এতে দাবি ছিলো- সিলেটের একটি চা বাগানকে নির্ধারিত করে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক এবং এর তদারকি করুক জেলা প্রশাসন, আর নজরদারি রাখুক ট্যুরিস্ট পুলিশ। কিন্তু আমাদের দাবি বাস্তবায়ন হয়নি।

এসব বাগানে ম্যানেজারদের যোগসাজশে চা শ্রমিক যুবকরা চাঁদাবাজির পাশাপাশি অনৈতিক কাজের সুবিধার্থে খোপ বা খুপড়ি তৈরি করে দিয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। আর এমন ঘটনা সিলেটের মালনিছাড়া চা বাগানেই বেশি ঘটে বলে জানান সিলেট ট্যুরিজম ক্লাব ও পর্যটন সমিতির সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তা না হলে এমন অপরাধ দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মালনিছড়া চা বাগানের ম্যানেজারের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। 

এ বিষয়ে চা-শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালা সিলেটভিউ-কে বলেন- সম্প্রতি এসব অভিযোগ আমাদের কাছেও এসেছে। শুনেছি- মালনিছড়া চা বাগানে এসব অপরাধ বেশি হয়। বাগানকেন্দ্রিক এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত সবাইকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার সুদ্বীপ দাস সিলেটভিউ-কে বলেন- চা বাগানগুলো মূলত: ব্যক্তি মালিকানাধীন। তাই এসব এলাকায় পুলিশের তদারিকও কম। তবুও আইনশৃঙ্খলার অবনতি যেখানেই হবে সেখানেই কাজ করবে পুলিশ। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানাপুলিশকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হবে। 

এ প্রসঙ্গে ট্যুরিস্ট পুলিশের সিলেট রিজিয়নের এসপি (পুলিশ সুপার) আবুল বাশার মোহাম্মদ আতিকুর রহমান সিলেটভিউ-কে বলেন- আমরা আসলে ট্যুরিস্ট স্পটগুলো নিয়ে কাজ করি। তবু বাগানের মধ্যেই যেহেতু ট্যুরিস্টদের হয়রানি করা হচ্ছে- আর ট্যুরিস্টদের নিরাপত্তা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব, তাই বাগান মালিকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলবো এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করবো। 


সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম