আমরা প্রায় সময়ই বাইরে বের হলে রাস্তায় বা নির্দিষ্ট  বাজারে শুধু পুরুষদের মাছ বিক্রি করতে দেখতে পাই। কিন্তু রোহেনা খানমের পথচলার গল্পটা একটু ভিন্ন। তিনি সংসারের হাল ধরতে স্থানীয় বিভিন্ন বাজারে মাছ বিক্রি করে বেড়ান এই সাহসী গৃহবধু। যা আমাদের পুরুষকেন্দ্রিক সমাজে সহজে চোখে পড়ে না।

 


মানুষের কাছে হাত পেতে টাকা চাওয়ার থেকে কাজ করে পয়সা উপার্জন করাই তার কাছে বেশি আনন্দের। অদম্য সাহস আর ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন হার না মানা সাহসী নারী রোহেনা। অভাব আর দারিদ্রতাকে দূর করতে সেই সাথে আর্থিক দিক থেকে অন্যের মুখাপেক্ষী না থেকে নিজেই একদিন স্বাবলম্বী হবেন এই প্রত্যাশা নিয়ে নেমে পড়েন জীবন সংগ্রামে। জীবনযুদ্ধে হার না মানা আত্মপ্রত্যয়ী সেই নারী শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের উত্তর গাজীনগর  গ্রামের বাসিন্দা।

 

তার সংসারে রয়েছেন অসুস্থ স্বামী ও ৬ সন্তান তার মধ্যে ১৪ বছরের এক মেয়ে  দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছে। তার দেখভাল আর সংসারের দু’মুঠো খাবার জোগাতে বাধ্য হয়ে নিজেই মাছ বিক্রি করতে নেমেছেন বাজারে। স্থানীয়রা তাকে পাগল বলে সম্বোধন করলেও থেমে নেই তিনি। সেই সঙ্গে উপজেলার পাথারিয়া, গণিগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানীয় বাজারে কোন কোন সময় কাঠাল,সবজি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতে দেখা যায় তাকে। অসুস্থ  স্বামী আজিজুর ও হৃদরোগে আক্রান্ত রিতার চিকিৎসা ব্যয় ও পরিবারের খরচ বহন করতে পুরুষ ব্যবসায়ীদের সাথে পাল্লাদিয়ে একমাত্র নারী মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

 

রোহেনা খানমের ৬ সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে পারবিনের বিয়ে হয়ে গেছে। অসুস্থ রিতার ছোট রোকেয়া ঢাকা থাকে। বড় ছেলে মুজিবুর রহমান ঢাকাতে কাজ করে তার ছোট ভাই সজিব রহমান স্কুল থেকে ঝড়ে পরে বাড়িতেই থাকে। সবার ছোট রাজিব মাদ্রাসাতে পড়ে।

 

রোহেনা খানম  জানান, ১৪ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় আজিজুর রহমানের  সাথে। আর বিয়ের পর থেকেই তিনি হাল ধরেন সংসারের। তিনি জানান কয়েক বছর ধরেই তিনি বাজারে মাছ বিক্রি করে আসছেন। এর আগে তিনি বাজারের ফুটপাতে সবজি ও ফল বিক্রি করতেন এখনও মাঝেমধ্যে বিক্রি করেন। তবে মাছ বিক্রির ব্যবসাটা তিনি নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

তিনি জানান, স্থানীয় বিভিন্ন বিল, হাওর ও পাইকারী মাছ বিক্রেতাদের কাছ থেকে তিনি মাছ সংগ্রহ করেন পরে তিনি তা বাজারে বিক্রি করেন। সারাদিন মাছ বিক্রি করে কোন কোন দিন ২০০ থেকে ৫০০-১০০০ এমকি কোন দিন ৫০০০ টাকাও লাভ করেন তিনি। তবে টাকার অভাবে তিনি ভাল মাছের চালান কিনতে পারেন না বলে জানান।

 

তিনি বলেন, আমার মেয়ে রিতা হৃদরোগে আক্রান্ত তার চিকিৎসার জন্য উপজেলা সমাজসেবা অফিস থেকে ইতিমধ্যে ৫০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছি কিন্তু তার চিকিৎসারর জন্য প্রচুর টাকার প্রয়োজন যা আমার সাধ্যের বাহিরে। আমি যেমন মাছ বিক্রি করি তেমনি রিতাকে দেখাশোনাসহ পরিবারের অনেক কাজও করতে হয়।

 

পুরুষদের সাথে একা নারী মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে মাছ বিক্রি করতে কোন সমস্যা হয়কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লোকে আমায় পাগলী বলে, আমাকে নিয়ে হাঁসি ঠাড্ডা করে তারপরেও আমি তাদের পাল্লাদিয়ে এই কাজ করে যাচ্ছি।

 

সুশীল সমাজের লোক শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, চাকরি ক্ষেত্রে অনেক নারী ভূমিকা রাখতে পারলেও ব্যাপকহারে ব্যবসাতে ভূমিকা রাখতে পারছেন না। আমাদের সিংহভাগ নারী এখনো সংসার কর্মেই নিয়োজিত। সর্বক্ষেত্রেই নারীদের জাগরণ দরকার। রোহেনা খানমের এই কাজটি দেখে হয়ত নারী জাগরণে ভূমিকা রাখবে। সব ধরণের  ব্যবসা ক্ষেত্রেও যে নারীরা ভৃমিকা রাখতে পারে তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করল রোহেনা।

 

পাথারিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো.শহীদুল ইসলাম বলেন, নারীরা অত্যন্ত সৃজনশীল ক্ষমতার অধিকারী। তারা সুযোগ পেলে যেকোনো কাজে পুরুষের সমান দক্ষতা প্রদর্শন করতে সক্ষম। সরকার যদি রোহেনা'র মত নারীদের উন্নয়নের জন্য আর্থিক সহায়তার অনুদান প্রদান করত তাহলে হয়ত তারা অনেকদূর এগিয়ে যেত।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/হিল্লোল/এসডি-০২