তাঁদের কারোই পায়ের নিচে ছিল না নিজস্ব মাটি কিংবা মাথার উপর ছাউনি। দয়াদক্ষিণায় থাকতেন পরের বাড়ি। নিজের বাড়ি হবে, ঘর হবে সেটা ছিল স্বপ্নাতীত। ভূমিহীন ও গৃহহীন হওয়ায় এলাকার লোকজনও নানা কথা শোনাতো। লোকলজ্জায় ভিটেমাটিহীন মানুষগুলো মুখে কুলুপ এঁটে রাখতেন। অসহায় এই মানুষগুলো অবশেষে খুঁজে পেয়েছেন নিজস্ব ঠিকানা।
 

মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া উপহারের ঘরে ঠাঁই হয়েছে তাদের। সিলেটের প্রান্তিক জনপদ গোয়াইনঘাট উপজেলার নন্দিরগাঁও ইউনিয়নে ‘নোয়াগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্পে’ ভিটেমাটিসহ ঘর পেয়েছেন একশত পরিবার। এবার নোয়াগাঁও’র এই প্রকল্পকে দেশের মডেল আশ্রয়ণ প্রকল্প করার উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। প্রকল্পে ঘরপ্রাপ্তদের আয় বৃদ্ধি ও স্বাবলম্বী করতে নেওয়া হয়েছে নানা পরিকল্পনা। আগামী একবছরের মধ্যে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে নোয়াগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্পকে মডেল প্রকল্পে রূপদানের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।


আশ্রয়ণ প্রকল্পটির কোন বাসিন্দা বেকার থাকবে না উল্লেখ করে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিলুর রহমান জানান, নোয়াগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্পটি হবে দেশের মধ্যে ব্যতিক্রম। এই প্রকল্পে আশ্রয় পাওয়া প্রতিটি পরিবার হবে স্বাবলম্বী। প্রতিটি নারী ও পুরুষকে প্রশিক্ষণের আওতায় এনে তাদেরকে কর্মদক্ষ করে তোলা হবে। এজন্য প্রকল্পের একশত পরিবারকে নিয়ে একটি সমবায় সমিতি গঠন করা হচ্ছে। সরকারের সহযোগিতা ও নিজেদের কর্মপ্রচেষ্টায় এই সমিতির মাধ্যমেই তারা নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাবে। প্রকল্পের প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্যদের সেলাইসহ হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদেরকে উপার্জনক্ষম করে তোলা হবে। পাশাপাশি হাঁস-মুরগী পালনের জন্য তাদেরকে দেওয়া হবে সরকারি সহায়তা।

ইউএনও আরও জানান, নোয়াগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্পটি ৫.৩৪ একর জায়গার উপর গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে একশটি ঘরের ভিটে ব্যবহার হয়েছে ২ একর জায়গা। বাকি ৩ একর ৩৪ শতক জায়গা ঘিরে নেওয়া হয়েছে মাস্টারপ্ল্যান। ইতোমধ্যে প্রকল্পের চারপাশে এক কিলোমিটার গভীর খাল খনন করা হয়েছে। সমবায়ের ভিত্তিতে এই খালে মৎস্য চাষ করবেন প্রকল্পের পরিবারগুলো। এতে বছরে বড় রকমের আর্থিক সহায়তা আসবে পরিবারগুলোতে। এছাড়া এই খালের পানি দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে পার্শ্ববর্তী ৩শ’ হেক্টর জায়গা চাষাবাদের আওতায় আসছে। এসব জায়গায় প্রকল্পের সদস্যদের জন্য বর্গাচাষের পাশাপাশি শ্রমিক হিসেবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আশ্রয়ণ প্রকল্পটির সদস্যদের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে এক হাজার ফলজ, বনজ ও ঔষধী গাছের চারা রোপন করা হয়েছে। সমবায়ের ভিত্তিতে এগুলো ভোগ করবেন প্রকল্পের পরিবারগুলো। এছাড়া প্রতিটি পরিবারকে বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে একটি করে পুষ্টি বাগান। যেখানে তারা নিজেদের চাহিদা পূরণের জন্য সবজি চাষ করছেন।
 

একটি সবুজ ও পরিচ্ছন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্প গড়ে তুলতে বৃক্ষরোপনের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে প্রকল্পের পরিবারগুলোকে সচেতন করা হবে জানিয়ে ইউএনও তাহমিলুর রহমান বলেন, ‘গৃহাস্থলির বর্জ্য থেকে কিভাবে কম্পোস্ট সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদন করা যায় এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রকল্প এলাকা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে সমবায় সমিতির দায়িত্বশীলরা ভূমিকা রাখবেন।’ এছাড়া প্রকল্পে সোলার স্ট্রিট লাইট স্থাপনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান ইউএনও।

নোয়াগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্পটির ৮শ’ মিটারের মধ্যে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় ও কিন্ডার গার্টেন স্কুল। তবে শিশুদের জন্য প্রকল্পে একটি প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয় করার পরিকল্পনার কথা জানালেন ইউএনও। এছাড়া নামাজ আদায় ও শিশুদের মক্তব শিক্ষার জন্য একটি মসজিদ নির্মাণের বিষয়টিও মাস্টারপ্ল্যানে রয়েছে বলে জানান তাহমিলুর রহমান।

ইউএনও তাহমিলুর রহমান জানান, ‘অনেক স্থানে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর হস্তান্তরের পর কেউ আর খোঁজ রাখে না। কিন্তু নোয়াগাঁও প্রকল্পটি আমরা দেশের একটি মডেল আশ্রয়ণ করতে চাই। গত ২২ মার্চ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নোয়াগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্পে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আমরা আরও অনুপ্রাণিত হয়েছি।’
 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ/পল্লব-১৪