সিলেট মহানগরীর প্রতিদিনকার চিত্র এখন প্রায় একইরকম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় অসহনীয় যানজটে আটকে থাকা সাধারণ মানুষ। অথচ নগরীতে গড়ে ওঠা বহুতল মার্কেট, শপিংমল, প্রাইভেট হাসপাতাল, বিভিন্ন রেষ্টুরেন্ট, স্কুল ও কলেজে নেই আলাদা কোনো পার্কিং ব্যবস্থা। যার ফলে নগরীর প্রধান সড়কগুলোর বেশিরভাগ জায়গা পরিণত হয়েছে অস্থায়ী গাড়ি রাখার স্থানে। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে যানজট, অন্যদিকে জনজীবন হয়ে উঠছে চরম দুর্বিষহ।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর জিন্দাবাজার, সোবহানীঘাট, শিবগঞ্জ, উপশহর, বন্দর বাজার, আম্বরখানা, সুবিদ বাজার, মদিনা মার্কেট, আখালিয়া, ইলেকট্রিক সাপ্লাইরোড, রিকাবীবাজার, তালতলা, ওসমানী মেডিকেল রোড, বাগবাড়ি, টিলাগড়সহ বিভিন্ন স্থানে নগরীর প্রধান সড়কের পাশে গাড়ি পার্কিং করে রাখা হয়।
সিলেট নগরীর বিভিন্ন মার্কেট, শপিংমল, প্রাইভেট হাসপাতাল, বিভিন্ন রেষ্টুরেন্ট, স্কুল ও কলেজের সামনে গেলে দেখা যায়, রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য গাড়ি, মোটরসাইকেল, এমনকি অ্যাম্বুলেন্সও। কারণ এসব ভবনের ভেতরে নিজস্ব কোনো পার্কিংয়ের কোনো জায়গা নেই। ফলে রোগী নিয়ে হাসপাতালে আসা আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে বাজার করতে আসা ক্রেতা এবং রেষ্টুরেন্টে খেতে আসা সকলকেই বাধ্য হয়ে গাড়ি রেখে দিতে হয় প্রধান সড়কের উপরেই। এতে কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো সড়ক যানজটে আটকে যায়।
সচেতন নাগরিকরা অভিযোগ করে বলছেন, ‘প্রতিটি বহুতল ভবনের নকশায়ই পার্কিং স্পেস রাখার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু ভবন মালিকরা সেই জায়গা দোকান বা অফিস হিসেবে ভাড়া দিয়ে দিচ্ছেন। প্রশাসনও এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ফলে আমরা সাধারণ মানুষ প্রতিদিন দুর্ভোগে পড়ি।’
নগরবাসীর দাবি, প্রশাসনকে অবশ্যই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পুরনো ভবনগুলোতেও বিকল্প ব্যবস্থা করে পার্কিং চালু করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন কোনো ভবনের নকশায় পার্কিং স্পেস বাদ পড়লে অনুমোদন বাতিল করতে হবে। সিলেটের ভবন মালিকরা যেন তাদের দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রশাসন যেন কঠোর নজরদারি চালু করে। নইলে নগরীর যানজট সমস্যা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, আর সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ হবে চরম।
একজন বন্দরবাজার স্ট্যান্ডের স্থানীয় সিএনজি অটোরিকশা চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি চালাতে হয়। রোগী নিয়ে আসা অ্যাম্বুলেন্সও পার্কিং না থাকায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। তখন পেছনের গাড়ি এগোতে পারে না। এতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় জরুরি রোগী ও সাধারণ যাত্রীরা।’
ফরিদ (ছদ্মনাম) নামের জিন্দাবাজার এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘অনেক মার্কেট নির্মাণের সময়ই পার্কিং স্পেস রাখা হয়নি। আর যেগুলো রাখা হয়েছিল সেগুলোও পরবর্তীতে দোকান বানিয়ে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরাও ভুক্তভোগী হচ্ছেন। কারণ ক্রেতারা সহজে গাড়ি পার্ক করতে না পেরে শপিংয়ে আসতে অনীহা প্রকাশ করছেন।’
সালমান নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘ক্রেতারা অনেক সময় গাড়ি রাখার জায়গা না পেয়ে মার্কেটে ঢোকার আগেই ফিরে যান। এতে ব্যবসায়ীদেরও ক্ষতি হচ্ছে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করুক।’
অন্যদিকে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ‘সিলেট একটি পর্যটন নগরী। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন। অথচ নগরীর প্রধান ভবনগুলোতে যদি পর্যাপ্ত পার্কিং স্পেস না থাকে, তবে নগরের যানজট কখনোই কমবে না। নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশা কঠোরভাবে অনুসরণ করা জরুরি। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আগামী কয়েক বছরে সিলেট নগরীতে চলাচলই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
পরিবহন শ্রমিক নেতারা বলছেন, ‘যানজট শুধু সময় নষ্ট করছে না। এটি অর্থনীতির ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। প্রতিদিন হাজার হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে শুধুমাত্র পার্কিং সংকট ও যানজটের কারণে। প্রশাসন যদি এখনই উদ্যোগ নেয়, তাহলে নগরবাসী স্বস্তি পাবে এবং সিলেটের অর্থনৈতিক কার্যক্রমও গতিশীল হবে।’
সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপন বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছি যে, নগরীর যেসব বাণিজ্যিক ভবনে পার্কিং নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ নোটিশ প্রদান ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে। আমরা আবারও ব্যবসায়ী পরিষদের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে আবেদন জানাবো। রাস্তায় অবৈধ পার্কিং বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এবং নগরীর যানবাহন ও জনসাধারণের চলাচলের স্বার্থে একটি পরিকল্পিত পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।
তিনি আরও বলেন, ‘সিলেট মহানগরীর ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে এবং নাগরিক সেবার মান উন্নত করতে অবৈধ পার্কিং ও নীতিবহির্ভূত ব্যবহার বন্ধে সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের প্রতি আমরা দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। জিন্দাবাজারসহ নগরীর অধিকাংশ বাণিজ্যিক ভবনে নিজস্ব পার্কিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে এসব ভবনের সামনেই গাড়ি পার্ক করে রাখা হয়, যা পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এ পরিস্থিতি ব্যবসায়িক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং ক্রেতাদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিচ্ছে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সিলেট নগরীর প্রধান সড়কগুলো প্রতিনিয়ত যানজটে অচল হয়ে পড়ছে। এর বড় একটি কারণ—বিভিন্ন মার্কেট, হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট, স্কুল-কলেজের নিজস্ব কোনো পার্কিং না থাকা। এসব স্থাপনায় আসা মানুষজন বাধ্য হয়ে গাড়ি দাঁড় করাচ্ছেন রাস্তার ওপর, ফলে অল্প সময়েই সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট। এমনকি অ্যাম্বুলেন্সও আটকে যাচ্ছে। এটি শুধু নাগরিক ভোগান্তির বিষয় নয়, এটি নগর ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা। সব বাণিজ্যিক ভবনের জন্য পার্কিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। যেসব ভবনে পার্কিং নেই, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। রাস্তা দখল করে রাখা যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে মাল্টিস্টোরি পাবলিক পার্কিং গড়ে তুলতে হবে। নগর পরিকল্পনায় শৃঙ্খলা ও দূরদর্শিতা ছাড়া একটি আধুনিক সিলেট গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এখনই ব্যবস্থা না নিলে নাগরিক দুর্ভোগ আরও বাড়বে।’
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী (পিপিএম-সেবা) বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা যানজট নিরসনে মাঠে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে নগরের বিভিন্ন মার্কেট ও প্রতিষ্ঠানে কোনো পার্কিং স্পেস নেই। বাধ্য হয়ে গাড়িগুলো রাস্তার পাশে দাঁড় করাতে হয়। তখন পুরো সড়কের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ভবন মালিক ও প্রতিষ্ঠান মালিকদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি। খুব শীঘ্রই নগরবাসী আমাদের এই পদক্ষেপগুলোও তাদের চোখে দেখতে পাবেন। আমাদের হাতে প্রচুর কাজ রয়েছে এক এক করে শেষ করে সিলেটকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন নগরী উপহার দেবো।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া




