নগরীর ব্যস্ততম এলাকা সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর। অন্যান্য দিনের মতোই সূর্য উঠেছে, বৃষ্টিও হয়েছে, যানবাহন চলছে, মানুষজন কাজে ছুটছেন। কিন্তু সেই প্রতিদিনের চেনা দৃশ্যের মাঝে একটি লাল ত্রিপল ও একটি ব্যানার নজর কেড়েছে সবার। সিলেটের দীর্ঘদিনের উন্নয়নবঞ্চনা ও সরকারি অবহেলার প্রতিবাদে সেখানে নীরবতার সাথেখ বসে আছেন এক যুবক। ব্যানারে বড় করে লেখা ‘সিলেটের সঙ্গে বৈষম্য কেন?’। তার হাতে কিংবা বসার আশপাশে দলীয় কোনো পতাকা নেই। হাতে কোনো মাইক্রোফোন নেই। তবু তাঁর এই নিরব প্রতিবাদ আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছে সিলেটের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার প্রতিধ্বনি। তাঁর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে হাজারো সিলেটবাসীর না বলা ক্ষোভ। একা শুরু করলেও এখন তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা, আর সিলেটের সাধারণ মানুষ।
ওই যুবকের নাম আব্দুলাহ মামুন সুজন। তিনি সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার ৬নং সুলতানপুর ইউনিয়নের আব্দুল আহাদের ছেলে এবং তিনি সিলেটের কনসালটেন্সি ফার্মের একজন ব্যবসায়ী।
বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) দুপুর ১ টা থেকে সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে সিলেটের উন্নয়নের স্বার্থে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা আদায়ের লক্ষ্যে ‘সিলেটের সঙ্গে বৈষম্য কেন?’ এই অনশন কর্মসূচি শুরু করেন তিনি।
তাঁর চারপাশে শোভা পাচ্ছে প্ল্যাকার্ডে লেখা নানা দাবিগুলো হলো- ‘সিলেটের জন্য বিশেষ বাজেট ঘোষণা করতে হবে, সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ৬ লেনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে, সিলেট বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে পাশাপাশি ডোমেস্টিক ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সংখ্যা বাড়াতে হবে, সিলেট থেকে ডোমেস্টিক ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে বিমানের টিকেটের দাম কমাতে হবে, সিলেট-ঢাকা ট্রেনের ডাবল লাইন নির্মাণ করতে হবে এবং নতুন ট্রেন বাড়াতে হবে, সিলেটে পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে, সিলেটের পর্যটন খাত উন্নয়নের জন্য বিশেষ বাজেট ঘোষণা করতে হবে।’
লাল ত্রিপলের নিচে হাতে ব্যানার ধরে থাকা এই তরুণের শান্ত প্রতিবাদে এখন জেগে উঠছে সিলেটের বিবেক। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শহরের তরুণ সমাজ। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও এসে যুক্ত হয়েছেন তাঁর সঙ্গে। কেউ কেউ পানি দিচ্ছেন। কেউ কেউ মেডিকেল সার্পোট দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ নিরবে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে তার সাথে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, সিলেট জেলা গণ অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক নাইম লস্কর, এনসিপি সিলেটের নেতা নুরুল ইসলাম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতা ইব্রাহীম নীলসহ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা এই অনশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
এই অনশন কর্মসূচিতে বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, ‘এই যুবকের সাহসী অবস্থান আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে। সরকারের প্রতি আমরা আহ্বান জানাই, সিলেটের উন্নয়ন দাবি এখনই মেনে নিতে হবে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতা ইব্রাহীম নীল বলেন, ‘আমরা ঢাকায় গেলে চোখে পড়ে ওখানে কী উন্নত রাস্তাঘাট, ট্রেন, বিমানবন্দর। আর সিলেটে এখনো পুরনো রাস্তায় জ্যামে বসে থাকতে হয়। আমাদের সঙ্গে কেন এমন বৈষম্য? সুজন ভাইয়ের এই আন্দোলন আমাদের নিজের আন্দোলন। আমরা সবাই এর অংশ।’
সিলেট জেলা গণ অধিকার পরিষদ আহ্বায়ক নাইম লস্কর বলেন, ‘সরকার বারবার বলেছে উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু সেই উন্নয়নের ছোঁয়া সিলেট পায় না। এখন আর শুধু বলা যাবে না—‘মানুষ চায় না’। এখন মানুষ মাঠে নেমেছে, প্রশ্ন তুলেছে। সরকার যদি এখনো সাড়া না দেয়, তবে এই আন্দোলন সারা দেশের আন্দোলনে রূপ নেবে।’
সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম বলেন, ‘এই তরুণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। একজন মানুষ চাইলে কীভাবে গোটা সমাজকে নাড়িয়ে দিতে পারে। আমরা যারা রাজনীতি করি, আমাদের দায়িত্ব ছিল এই প্রশ্নগুলো তোলা। কিন্তু এই তরুণ সেটি করেছে। আমরা সবাই এখন তাঁর পাশে আছি। আমরা এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক রঙ দিতে চাই না। আমরা চাই সরকারের কাছে সিলেটবাসীর যৌক্তিক দাবি পৌঁছে যাক।’
এই আন্দোলনের উদ্যোক্তা আব্দুল্লাহ মামুন সুজন বলেন, ‘আমি কোনো দল করি না। আমি কোনো গোষ্ঠীর হয়ে এখানে আসিনি। আমি একজন সাধারণ সিলেটবাসী। আমি শুধু জানতে চাই আমাদের সঙ্গে এমন বৈষম্য কেন?। প্রতিবারই বাজেটে, পরিকল্পনায়, অবকাঠামোগত উন্নয়নে সিলেট উপেক্ষিত থাকে। আমি চাই, সরকার এই প্রশ্নের উত্তর দিক এবং বাস্তব প্রদক্ষেপ নিক। আমরা সিলেটবাসী উন্নয়ন চাই। আমরা বারবার উন্নয়ন হতে বঞ্চিত হচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত আমরা এই অনশন কর্মসূচি চালিয়ে যাবো।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া




