বিশ্বের দ্বিতীয় লন্ডন খ্যাত শহর সিলেট। আর এই সিলেটেই যখন ভিক্ষুকদের ভিক্ষাবৃত্তি বৃদ্ধি পায় তখন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন সিলেটবাসী। ভিক্ষুকদের এই ভিক্ষাবৃত্তিতে প্রায়ই হেনস্থার শিকার হন সিলেট ও সিলেটের বাইরে থেকে ঘুরতে আসা পর্যটকরা। সিলেট নগরীর প্রতিটি বিপণী বিতান মার্কেটগুলো বা শহরের প্রতিটি বাজারে ও মোড়ে মোড়ে এবং রাস্তাঘাটে শুধু ভিক্ষুক আর ভিক্ষুক। কেউ দলবদ্ধভাবে আবার কেউ কেউ পৃথক হয়ে ভিক্ষা করছেন। সিলেট নগরে এমনিতেই স্থায়ী অনেক ভিক্ষুক রয়েছেন। সিলেটের কোনো উপজেলাই এখন ভিক্ষুকমুক্ত নয়। ভিক্ষাবৃত্তি সমাজের নিকৃষ্টতম পেশা হলেও বর্তমানে ভিক্ষাবৃত্তি যেন লাভজনক পেশায় পরিণত হয়েছে।


অনুসন্ধানের দেখা যায়, অল্প সময়ে ভিক্ষাবৃত্তি লাভজনক পেশা হওয়ায় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ভিক্ষুকের সংখ্যা। এই সংখ্যার তালিকায় ভিক্ষুকদের নাম সিলেটে ইদানিং কয়েকগুণ বেড়েছে। নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলির মোড়ে, কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান, চায়ের দোকান, বিপণি-বিতান, বেশি যানজটের সড়ক ও ট্রাফিক সিগন্যাল, মসজিদ, বাস, ট্রেন, এটিএম বুথ, শপিংমলের সামনে হাজার হাজার ভিক্ষুক ভিক্ষা করছেন। ভিক্ষাবৃত্তিতে কষ্ট না করে প্রতিদিন ২-৩ হাজার টাকা। আবার নগরীতে বিভিন্ন স্থানে কম দামে আবাসিক হোটেল থাকায় ভিক্ষুকদের থাকার কোনো কষ্ট হয় না। নির্দিষ্ট বাজেটের ভেতরে এই সকল আবাসিক হোটেলে থেকে দেদারসে নগরীতে ভিক্ষাবৃত্তি করে দিন পাড়ি দিচ্ছেন। আবার স্বাভাবিক ভিক্ষুকের পাশাপাশি অন্যদিকে বিভিন্ন মৌসুমকে ঘিরে নগরীতে মৌসুমী ভিক্ষুকদের সংখ্যা বেড়ে যায় কয়েকগুন। আর এই মৌসুমী ভিক্ষুকরা সিলেটে আসেন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। বিভিন্ন মৌসুমকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ভিক্ষুকদের পাশাপাশি এই মৌসুমী ভিক্ষুকদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায় কয়েকগুন আর তাতেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেন নগরবাসী। আর এই ভিক্ষাবৃত্তির পেছনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে বেশ কয়েকটি সংগঠন ও বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।



মাঠ পর্যায়ের জরিপে দেখা যায়, নগরীতে পুরুষের চাইতে শিশু ও নারী ভিক্ষুকদের সংখ্যা অনেক বেশি। বেশিরভাগ নারী ভিক্ষুকদের সংখ্যা ৪০ থেকে ৬০ এর মধ্যে আবার শিশুদের বেলায় দেখা যায় ২ বছর থেকে শুরু করে ১৫ থেকে ১৮ বছরের ভিক্ষুকরা রাস্তার দখল নিচ্ছেন। নগরীতে আসা লোকজনও শিশুদের দেখে ভিক্ষা দিচ্ছেন মনমতো। অন্যদিকে, সিলেট নগরীর জিন্দাবাজার এলাকায় একধরনের ভিক্ষুক রয়েছেন। তারা ভিক্ষাবৃত্তির জন্য পথচারীদের পা পর্যন্ত চেপে ধরেন।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট নগরীতে বেশ কয়েকটি’ স্থানে কম দামের আবাসিক হোটেল রয়েছে। যেমন- বন্দর বাজার, শাহজালাল (রহ.) মাজার এলাকা, সোবহানীঘাট, শাহপরান (রহ.) মাজার এলাকা, টিলাগড় এলাকা, আম্বরখানা এলাকা, মদিনা মার্কেট, আখালিয়া এলাকা, বাগবাড়ি এলাকা, শেখঘাট এলাকা, ওসমানী মেডিকেল এলাকা, কদমতলী এলাকা, হুমায়ুন রশীদ চত্তর এলাকা, লাউয়াই এলাকায় কমদামী আবাসিক হোটেলসহ সিলেট নগরীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় কম বাজেটের ব্যাচেলর বাসা ভাড়া নিয়ে ভাড়ায় থাকেন তারা। আবার উল্লেখিত এলাকাগুলোতে আবাসিক কমদামি হোটেলে অনেক ভিক্ষুকরা ভাড়ায় থাকেন দৈনিক কিংবা মাসিক চুক্তিতে। এসব হোটেলে ভাড়া কম (মাসিক হিসেবে তিন থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায়) কক্ষ ভাড়া পাওয়া যায়।


অন্যদিকে সিলেটের এয়ারপোর্ট এলাকার ভিক্ষাবৃত্তির ধরণ একটু ভিন্ন। তারা বিদেশ থেকে দেশে আসা যাত্রীদের হাত-পা ধরে টানাটানি শুরু করে দেন। এতেও কোনো কাজ না হলে যাত্রীদের সাথে থাকা ব্যাগ-লাগেজ ধরেও টানাটানি করতে থাকেন। তবে বিমানবন্দরের ভিক্ষুকদের চাহিদা একটু ভিন্ন। টাকা দিলে তারা তা নিতে গড়িমসি করে আবার অনেক সময় টাকা নেয় না তারা। টাকাতে নয় বরং ডলার, পাউন্ড, রিয়াল কিংবা ইউরোতে সন্তুষ্টি মিলে তাদের। তাদের গ্রুপের মদদদাতারা একটু বেশিই চাহিদাশীল। ডলার, পাউন্ড, রিয়াল কিংবা ইউরো না দিলে কটুক্তিসহ নানা নেতিবাচক মন্তব্য করতে শোনা যায় তাদের। ভিক্ষুকরা বিমানবন্দরে ভিক্ষাবৃত্তির জন্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইটকে টার্গেট করেন। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সঙ্গে ভিক্ষাবৃত্তির কী সম্পর্ক- এমন প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানবন্দরে কর্মরত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের কাছে ডলার-পাউন্ড চাওয়ার জন্যই এমন অভিনব কায়দা বেছে নিয়েছেন ভিক্ষুকরা। ফলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সূচি অনুযায়ী এয়ারপোর্টে তাদের আনাগোনা বাড়ে।


‘ভিক্ষাবৃত্তি ও ভিক্ষুকদের নির্দিষ্ট কোনো অভিযান না থাকায় নগরীতে দেদারসে বাড়ছেন ভিক্ষুক। ভিক্ষুক সিন্ডিকেটের আদলে তৈরি হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ। ভিক্ষুকদের এই চক্রকে প্রতিহত করার পাশাপাশি পেশাদার ভিক্ষুকদের চিহ্নিত করে নিয়ম অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে অভাবীদের সাহায্যের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সুতরাং,ভিক্ষাবৃত্তির লজ্জা থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে হবে এবং এর পেছনের সিন্ডিকেট চক্রকে ধ্বংস করতে হবে বলে মন্তব্য করছেন সিলেটের সুশীল সমাজের নাগরিকবৃন্দরা।’


তারা বলছেন, ‘বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় অসহায়, দুর্বল, দরিদ্র ও পঙ্গুরা ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়েন। অপমানকর হলেও পুনর্বাসন আর ভরণপোষণের ব্যবস্থা না থাকায় তারা ভিক্ষা করতে বাধ্য হন। কিন্তু এ ধরনের ভিক্ষুকের সংখ্যা এখন খুবই কম। এখনকার ভিক্ষাবৃত্তি পরিণত হয়েছে লাভজনক বাণিজ্যে। সিলেটে কয়েক দশক ধরে কয়েকটি চক্রের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে ভিক্ষাবৃত্তির সিন্ডিকেট। রীতিমতো এটিকে অনেকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সাবেক সরকাররা দশ বছরেরও বেশি সময় আগে ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল ও পুনর্বাসনের জন্য যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন তা ব্যর্থ হয়েছে। উন্নয়নের যত প্রচেষ্টাই থাকুক, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় যে মানুষ অভাব সামলে নিতে পারছে না তা নয় বরং ভিক্ষাবৃত্তিতে কষ্ট না করে প্রতিদিন ২-৩ হাজার টাকা আয় করা যায় বলেই এই দলে লোক বাড়ছে প্রতিনিয়ত। এখন যে হারে ভিক্ষুক আসে সেটি কয়েক বছর আগেও এমন ছিল না।’


নগরীর কয়েকটি হোটেল ব্যবসায়ীরা বলেন, আমাদের অনেক কক্ষের ভাড়া দেড়শ’ টাকা। ভিক্ষুক কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভাড়া অনেক সময় আরো কম দেওয়া হয়। ভিক্ষুক ও নিম্ন আয়ের মানুষের কথা ভেবে বিভিন্ন সময় মাসোয়ারা ভাড়া থেকে ৪-৫শ’ টাকা কম রাখা হয় তাদের কাছ থেকে।  


ফেসবুক ভিত্তিক পেইজ মানুষের জন্য সংগঠনের পরিচালক জুনেদ আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘ভিক্ষাবৃত্তির নামে সিলেটে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এলাকাভিত্তিক ভিক্ষুক চক্র হয়ে গেয়ে। এই ভিক্ষুকদের জন্য রাস্তায় চলাচল করা যাচ্ছে না ঠিকমতো। আবার সিলেট বিমানবন্দরেও তারা প্রবাসীদের হয়রানি করছে। যা কোনোভাবেই সঠিক কাজ নয়। এদের নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। প্রশাসনের উচিৎ দ্রুত একটা ব্যবস্থা নিয়ে ভিক্ষুকচক্রকে ধ্বংস করতে। প্রশাসন তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে ভিক্ষুকদের শেল্টার দাতাদের নেপথ্যে কারা আছেন।’


সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন মনে করেন, ভিক্ষুক নির্মূলে পুনর্বাসনের সঙ্গে সঙ্গে পেশাদার ও মৌসুমী ভিক্ষুকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলছিলেন, ‘অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। আবার অনেককে বাণিজ্যিকভাবেও ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করছে একটা সিন্ডিকেট। তাদেরকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। পাশাপাশি ভিক্ষার যে মূল কারণ দারিদ্র সেটার দিকে নজর দিতে হবে। তাদের পুনর্বাসনের আওতায় আনতে হবে।’


সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, প্রবাসী যাত্রীদের উত্যক্ত কিংবা বিরক্তির অভিযোগটি সঠিক। এদের নিয়ন্ত্রণে বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনে এপিবিএন, আনসার সদস্যদের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা কাজ করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনবরত তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তারপরও অনেকে ফাঁক-ফোকর দিয়ে কীভাবে ঢুকে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ চাইলে তাদের স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করতে পারে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।


সিলেট বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব (কম্পিউটার অপারেটর) মো. আবুল হাসনাত বলেন, ‘ভিক্ষুকদের জন্য সিলেটে পূনর্বাসন কার্যক্রম রয়েছে। জেলা প্রশাসকে সভাপতি করে একটি কমিটি আছে। সরকার থেকে বরাদ্ধ আসা মাত্র ওই কমিটির মাধ্যমে সিলেটে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। বিশেষ করে, তাদের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করার জন্য উদ্ভুত করা হয়। কোনো কোনো সময় বিভিন্ন ফুড কোর্ট, সেলাই মেশিন, ভ্যান, রিকশাসহ বিভিন্ন উপকরণ দেওয়া হয়।’ ভিক্ষুকদের তালিকার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘সিলেটের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ভিক্ষুকদের তালিকা রয়েছে। এই তালিকার বাইরে আর কোনো পরিসংখ্যান প্রশাসনের কাছে নেই। তবে দিন দিন ভিক্ষুকের লিস্ট অনেক দীর্ঘ হচ্ছে। তালিকার বাইরে অসংখ্য ভিক্ষুক রাস্তায় ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছেন। যেটা পথচারীদের জন্য খুবই বিরক্তিকর।’


এই বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের মুঠোফোনে একাধিক ফোনকল দিলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় নি।


এদিকে ২০১৭ সালে সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক নুরেমি জামান নিজ উদ্যোগে সিলেটকে ভিক্ষুকমুক্ত করার উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়নের আগেই তিনি বদলি হন। এছাড়া দেশে ভিক্ষুকমুক্তকরণে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আবার ওই বছরের শুরুতে সিলেটে ভিক্ষুক শুমারির উদ্যোগ নেয় ‘পরিবর্তন চাই’ নামে একটি সংস্থা। ‘ভিক্ষা নয় কর্ম চাই, দয়া নয় সম্মান চাই’ এই স্লোগান সামনে রেখে পঙ্গু ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন, দুস্থ ও অসহায় ভিক্ষুকদের কর্মসংস্থান এবং ব্যবসায়ী ভিক্ষুকমুক্ত করতেই এই উদ্যোগ নেয় তারা। নগরের ২৭টি ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ করে ভিক্ষুকদের শুমারি তথ্য উপাত্ত ডাটাবেজ করার উদ্যোগ নেয়। তবে এই ভিক্ষুক শুমারি এখনও শেষ হয়নি। জেলা প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে, ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনে সরকারি উদ্যোগে কাজ করা হচ্ছে। একটা সময় ভিক্ষুকমুক্ত সিলেট গড়া সম্ভব হবে।


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া