ছবি: সিলেটভিউ গ্রাফিক্স।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। নির্বাচন যতো ঘনিয়ে আসছে, সিলেটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপক জোরদার করা হচ্ছে। নির্বাচন যতোটুকু সন্নিকটে আসছে, ততই জেলার বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত অভিযানে একের পর এক অবৈধ অস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধারের খবর সামনে আসছে। ইতোমধ্যে র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির অভিযানে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, গ্রেনেড ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। নির্বাচনকালীন সহিংসতা রোধ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহানগরসহ আশপাশের এলাকায় বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বাহিনী।

 


নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, পাখি শিকারের জন্য ব্যবহৃত এয়ারগান। যা একসময় শিকারি সরঞ্জাম হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন এই পাখি শিকারী অস্ত্র নীরবে রূপ নিচ্ছে ভয়ংকর আগ্নেয়াস্ত্রে। ভারত সীমান্তঘেঁষা সিলেট জেলার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে দেশে ঢুকছে নিষিদ্ধ এই এয়ারগান। আর দেশে প্রবেশের পর সেগুলো সন্ত্রাসীদের হাতে বদলে যাচ্ছে মানুষ হত্যার অস্ত্রে। সম্প্রতি র‌্যাব ও পুলিশের নিয়মিত অভিযানে একের পর এক অস্ত্র উদ্ধার অব্যাহত রয়েছে। আর এসব অভিযানে এয়ারগান পরিবর্তন করে তৈরি করা একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। ভারত সীমান্তঘেঁষা সিলেট বিভাগের সীমান্তের দুর্বল রুট, নিষিদ্ধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ এবং অপরাধমূলক ব্যবহারের যোগসূত্র খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

 

গত একমাস ৬ দিনে সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ পরিত্যক্ত অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে র‌্যাব ও বিজিবি। সর্বশেষ সোমবার (৫ জানুয়ারি) রাতে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার লালারগাঁও এলাকার একটি যাত্রী ছাউনি থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১টি দেশীয় ওয়ান শুটার পাইপগান ও ৫টি পেট্রোল বোমা উদ্ধার করে র‌্যাব। এর আগের দিন রবিবার (৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও গ্রাম থেকে ১১টি এয়ারগান উদ্ধার করা হয়। একইদিন গভীর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর এলাকায় ২টি এয়ারগান ও ৪৪০টি গুলি উদ্ধার করা হয়।

 

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) রাতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা গ্রামে একটি চা বাগান এলাকা থেকে ২টি এয়ারগান ও গুলি উদ্ধার করা হয়। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) রাতে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ রায়গড় এলাকা থেকে একটি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে র‌্যাব। শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) রাতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার গুলের হাওর এলাকা থেকে ৬টি এয়ারগান ও ২০টি গুলি উদ্ধার করা হয়।

 

শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সেন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকা থেকে ২টি পাইপগান উদ্ধার করা হয়। বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার মজিদপুর এলাকার একটি ইটভাটা থেকে ১টি দেশীয় পাইপগান উদ্ধার করা হয়। মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) রাতে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পিয়াইন সেতুর নিচ থেকে একটি জাপানি রিভলবার ও বিস্ফোরক সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।

 

এর আগে শনিবার (২০ ডিসেম্বর) রাতে সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলার পান্তুমাই এলাকা থেকে ভারতীয় একটি এয়ারগান উদ্ধার করে বিজিবি। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) গভীর রাতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পূর্ব জালালপুর এলাকা থেকে ২টি এয়ারগান ও ১১০টি গুলি উদ্ধার করা হয়। এছাড়া মঙ্গলবার (২ নভেম্বর) রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ভাদুগর শান্তিনগর এলাকা থেকে একটি পাইপগান উদ্ধার করা হয়।

 

র‌্যাব ও বিজিবি জানায়, উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও বিস্ফোরকগুলো নাশকতার কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে পরিত্যক্ত অবস্থায় রাখা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিটি ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব না হলেও উদ্ধারকৃত আলামতগুলো সংশ্লিষ্ট থানায় জিডিমূলে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় মহানগরীর বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে দুবৃর্ত্তরা হামলা চালায়। এসময় সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে ১০১টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৫ হাজার ৭৪০ রাউন্ড গুলি লুট হয়। দীর্ঘ অভিযানে এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা গেছে ৮৫টি অস্ত্র ও ৫৪১ রাউন্ড গুলি। এখনও নিখোঁজ রয়েছে ১৬টি অস্ত্র এবং ৫ হাজার ১৯৯ রাউন্ড গোলাবারুদ।


এদিকে র‌্যাব জানায়, গত  ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত র‌্যাব-৯, সিলেট বিভাগ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার দায়িত্বপূর্ণ এলাকা থেকে সর্বমোট ৩৩টি দেশী ও বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র, ১০০ রাউন্ড গুলি, ম্যাগাজিন-৪টি, ৪৮৮০ গ্রাম বিস্ফোরক, ২৪টি ডেটোনেটর, ১টি সাউন্ড গ্রেনেড এবং বিপুল পরিমাণ এয়ারগানের গুলিসহ ৩৯টি এয়ারগান উদ্ধার করেছে।

 

র‌্যাব জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর উৎস ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে তদন্ত চলছে। প্রয়োজনে আদালতের অনুমতি নিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার হবে বলেও জানানো হয়েছে। সিলেট বিভাগীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে র‌্যাব-৯ এর গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

 

এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, সময়মতো এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকলে নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য সহিংসতা অনেকাংশে কমে আসবে। তারা একই সঙ্গে গুজব ও উসকানি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে সাধারণ মানুষকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

 

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৯)–এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, ‘এয়ারগান পরিবর্তন করে তৈরি করা একাধিক শটগান বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থান থেকে এয়ারগানও জব্দ করেছে র‌্যাব। এয়ারগান পরিবর্তন করে শটগান তৈরির সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত করতে র‌্যাব সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।’ তিনি সিলেটভিউকে আরও জানান, ‘মহানগরীর বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের মধ্যে গত ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে দুটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একটি তরাশ পিস্তল এবং অপরটি একটি গ্যাস গান। এছাড়া সর্বশেষ একটি সাউন্ড গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়েছে, যা গত ২০২৪ সালে সিলেটের একটি থানা থেকে লুট হয়েছিল।’

 

তিনি বলেন, ‘র‌্যাবের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি টহল ইউনিট নিয়মিতভাবে গাড়ি নিয়ে এলাকায় তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।’ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়, সে লক্ষ্যে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, জনসমাগমস্থল ও সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে র‌্যাবের টহল ও চেকপোস্ট জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সভা-সমাবেশকে কেন্দ্র করেও নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।’

 

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি মিডিয়া (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর মহানগরীর বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুন্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের মধ্যে এখনো ১৬টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অস্ত্র উদ্ধারে আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। কোথাও অস্ত্র বা গুলির অবস্থান শনাক্ত হলে, দেশের যেকোনো প্রান্তে অভিযান চালিয়ে তা উদ্ধার করা হবে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।’ তিনি সিলেটভিউকে আরও বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে কেউ যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিনষ্ট করতে না পারে, সে লক্ষ্যে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা পুলিশের নিয়মিত ও চলমান কার্যক্রমের অংশ।’

 

সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি)-এর অধিনায়ক জানান, ‘সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র পাচার ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির অভিযানিক কার্যক্রম ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। দেশের স্থিতিশীল পরিস্থিতিকে যেন কোনোভাবেই এসব অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান এর মাধ্যমে অস্থিতিশীল করতে না পারে এ ব্যাপারে বিজিবি সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে।’

 

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া