বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হওয়ায় বাংলাদেশজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ। দেশের বিভিন্ন সড়ক, মহল্লা ও গ্রামে শোভা পাচ্ছে নানা দেশের পতাকা। তবে বিশেষভাবে চোখে পড়ছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকা। যদিও ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ নিজে ২০২৬ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি।
তবুও বিশ্বের অন্যতম উচ্ছ্বসিত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের একটি বড় অংশের বাস বাংলাদেশে। মে মাস থেকেই দুই দলের সমর্থকরা বিশাল আকৃতির পতাকা টানিয়ে নিজেদের সমর্থন জানানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। আবাসিক এলাকার বাইরে স্থাপন করা হয়েছে লিওনেল মেসির বড় বড় কাটআউট। রাজধানীর অভিজাত গুলশান এলাকার ক্রীড়া সামগ্রীর বাজারগুলোতেও ভিড় করছেন সমর্থকরা। সেখানে প্রায় ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল দলের জার্সির রেপ্লিকা।
ভৌগোলিক বা রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার বিশেষ কোনো সম্পর্ক না থাকলেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই দুই লাতিন আমেরিকান দেশের ফুটবল দলের প্রতি বাংলাদেশিদের আবেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বকাপ এলেই বন্ধু-স্বজনদের মধ্যেও সমর্থন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়।
সম্প্রতি হবিগঞ্জে একটি স্থানীয় ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে কয়েক ডজন মানুষ আহত হন। অন্যদিকে শরীয়তপুরের কিছু তরুণ ঘোষণা দিয়েছেন, ২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপ শিরোপার অপেক্ষায় থাকা ব্রাজিল আবার চ্যাম্পিয়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা বিয়ে করবেন না।
যদিও ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাই সবচেয়ে জনপ্রিয়, তবুও অন্য দেশের দলগুলোর প্রতিও মাঝে মাঝে আগ্রহ দেখা যায়। এ সপ্তাহে ৭২ বছর বয়সী আমজাদ হোসেন ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা বানিয়ে আলোচনায় আসেন। পতাকাটি তৈরির জন্য তিনি নিজের কিছু জমিও বিক্রি করেছেন। তার স্বপ্ন, বিশাল এই পতাকা একদিন জার্মানির কোনো জাদুঘরে স্থান পাবে।
২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়েও বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। দেশটির দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশিদের নরওয়েকে সমর্থন করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা মনে করিয়ে দিয়েছে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি ছিল নরওয়ে।
দূতাবাসের বার্তায় বলা হয়, ‘তাহলে কী বলো, বাংলাদেশ? এবার আন্ডারডগদের সমর্থন করার সময়। একসঙ্গে বড় স্বপ্ন দেখার সময়।’
এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় আয়োজিত এই আসরে রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। টুর্নামেন্ট চলবে ১৯ জুলাই পর্যন্ত।
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম ২০২২ বিশ্বকাপের সময় আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়। তখন ফিফা এবং আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা বাংলাদেশের সমর্থন দেখে বিস্মিত ও অভিভূত হয়েছিলেন। আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশিদের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাডোনা।
ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশ শাসকেরা কলকাতায় ফুটবল খেলার প্রচলন করেন। পরে ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে তরুণেরা অনুপ্রেরণার খোঁজে ছিলেন। সে সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দল ব্রাজিল এবং কিংবদন্তি পেলে হয়ে ওঠেন তাদের নায়ক। তার জনপ্রিয়তা বাংলাদেশের বহু প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীদের প্রভাবিত করেছে।
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশে টেলিভিশনের বিস্তার ঘটলে ফুটবলের জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে। অনেক বাংলাদেশির কাছে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপই ছিল প্রথম রঙিন সম্প্রচারিত বিশ্বকাপ। ওই আসরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার স্মরণীয় গোলগুলো কেবল ফুটবলের ঘটনা ছিল না; অনেকের কাছে তা ছিল সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতীকী এক বিজয়ের প্রতিচ্ছবি।
বর্তমান প্রজন্মের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কাছে ম্যারাডোনার শূন্যতা পূরণ করেছেন লিওনেল মেসি। অন্যদিকে ব্রাজিল সমর্থকদের বড় ভরসার নাম নেইমার।
তবে এই উন্মাদনা কখনো কখনো সহিংস রূপও নিয়েছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ চলাকালে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থক গোষ্ঠীর সংঘর্ষে বাংলাদেশে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০১৪ সালে বৈদ্যুতিক তারে পতাকা টাঙাতে গিয়ে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে ব্রাজিলের পতাকা টাঙানোর সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক ১২ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যু হয়। একই বছর প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের শোভাযাত্রার সংঘর্ষে এক ব্যক্তি ও তার ছেলে গুরুতর আহত হন।
বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও, বিশেষজ্ঞরা উচ্ছ্বাস উদ্যাপনের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সহনশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০৫



