ছবি: এআই।

সিলেটের রেল যোগাযোগে আসছে নতুন এক পরিকল্পনা। দীর্ঘদিনের ধীরগতির ট্রেন যাত্রা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত রেলপথকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চীনের সম্ভাব্য অর্থায়নে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া বৃহৎ প্রকল্পের আওতায় নতুন ট্রেন সংযোজনের পাশাপাশি ট্রেনের গতি প্রায় দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ রেলব্যবস্থার পুরোনো বিতর্ক, কারিগরি চ্যালেঞ্জ এবং ব্যয়সংক্রান্ত নানা প্রশ্নও সামনে রয়েছে। তবু প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সিলেট অঞ্চলের রেল যোগাযোগে ঘটতে পারে ব্যাপক পরিবর্তন।

 

রেল মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে মিটারগেজ ইঞ্জিনের তীব্র সঙ্কট রয়েছে। এই সঙ্কট নিরসনে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চীন ২০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন অনুদান হিসেবে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এ লক্ষ্যে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো হয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চীনা অনুদানের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহী।

 

অন্যদিকে, আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত রেলপথকে মিশ্র গেজে রূপান্তরের পরিকল্পনাও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। এই ব্যবস্থায় একই লাইনে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ উভয় ধরনের ট্রেন চলাচল করতে পারবে। ২০১৯ সালে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে চীনের সঙ্গে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছিল। সে সময় প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। তবে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ তুলে তৎকালীন সরকার আপত্তি জানালে চীন পরে প্রকল্পটি থেকে সরে দাঁড়ায়।

 

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আখাউড়া-সিলেট রুটের মূল ও শাখা লাইন মিলিয়ে প্রায় ২৩৯ দশমিক ১৪ কিলোমিটার রেলপথ এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। বর্তমানে পুরো রুটটি মিটারগেজ হওয়ায় গতি ও পরিবহন সক্ষমতা সীমিত।

 

রেলওয়ে সূত্র জানায়, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আবারও প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি। এর আগে ২০১৭ সালেও প্রতিষ্ঠানটিকে প্রকল্পের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চীনের এক্সিম ব্যাংক প্রকল্পে ঋণ সহায়তা দেবে এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে প্রতিষ্ঠানটি।

 

রেল কর্তৃপক্ষের মতে, আখাউড়া-সিলেট রেলপথ দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত দুর্বলতায় ভূগছে। বড় উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা থাকায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। ফলে বর্তমানে এই পথে নতুন ট্রেন চালু করা কিংবা বিদ্যমান ট্রেনের গতি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, মিটারগেজ রেলপথের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো এর কম গতি ও সীমিত বহনক্ষমতা। এ ধরনের লাইনে ছোট আকারের ট্রেন চলাচল করে, ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের পরিমাণও তুলনামূলক কম থাকে। বিপরীতে ব্রডগেজ লাইনে বড় আকারের ট্রেন পরিচালনা করা যায়, যা অধিক গতি এবং বেশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি করে। মিশ্র গেজ ব্যবস্থা চালু হলে এই সীমাবদ্ধতার বড় অংশ দূর হবে। একই লাইনে ব্রডগেজ ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হওয়ায় বড় ট্রেন পরিচালনা, মালবাহী পরিবহন বৃদ্ধি এবং আন্তঃজেলা ও আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ আরও সহজ হবে।

 

এদিকে অবকাঠামো খাতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে চীনের অর্থায়নে সড়ক, সেতু ও রেল খাতের প্রায় ২০টি প্রকল্পের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে সরকার। এর মধ্যে আখাউড়া-সিলেট রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্পও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এসব প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

 

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরে এসব প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ২১ ও ২২ জুন দুই দিনের সফরে তাঁর কুয়ালালামপুর যাওয়ার কথা রয়েছে এবং সেখান থেকে চীন সফরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তাঁর প্রথম বিদেশ সফর।

 

সড়ক ও রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েক লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। তবে সব প্রকল্প একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না-ও হতে পারে। ধাপে ধাপে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগোনোর পরিকল্পনা রয়েছে।

 

সব মিলিয়ে, আখাউড়া-সিলেট রেলপথকে মিশ্র গেজে রূপান্তরের উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি একদিকে বর্তমান সীমাবদ্ধতা দূর করার চেষ্টা, অন্যদিকে ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ ব্রডগেজ নেটওয়ার্কে রূপান্তরের পথও তৈরি করতে পারে। তবে প্রকল্প’র বাস্তবায়ন, অর্থায়ন ও সময়সীমা নির্ভর করবে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতার ওপর।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া