বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ সেনেগালের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে বেলজিয়াম। একসময় ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা দলটি ম্যাচের শেষ কয়েক মিনিটে ঘুরে দাঁড়িয়ে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তের পেনাল্টিতে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়েছে। এই নাটকীয় জয়ের পর বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া বলেছেন, ‘বিশ্বাস থাকলে ফুটবলে সবকিছুই সম্ভব।’

ম্যাচের শুরু থেকেই দারুণ ছন্দে ছিল সেনেগাল। ৫১ মিনিটের মধ্যেই হাবিব দিয়ারা ও ইসমাইলা সাররের গোলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আফ্রিকার দলটি। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত সেই ব্যবধান ধরে রেখে শেষ ষোলোর পথে এগোচ্ছিল পাপে থিয়াওয়ের শিষ্যরা।


কিন্তু শেষ মুহূর্তে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। ৮৬ মিনিটে টমাস মুনিয়েরের ক্রস থেকে গোল করে বেলজিয়ামকে ম্যাচে ফেরান রোমেলু লুকাকু। তিন মিনিট পর লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ডের ক্রসে হেডে সমতা ফেরান অধিনায়ক ইউরি টিলেমান্স। ফলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

অতিরিক্ত সময়েও দুই দল সমানতালে লড়াই চালিয়ে যায়। যখন ম্যাচ টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, তখন ১২৪তম মিনিটে বক্সের ভেতর লামিন কামারার চ্যালেঞ্জে ফাউলের শিকার হন টিলেমান্স। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) পর্যালোচনা শেষে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। ১২৫তম মিনিটে স্পটকিক থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করে বেলজিয়ামকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন টিলেমান্স। এরপর আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি সেনেগাল।

এই গোলটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে ১২৪ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে করা সর্বশেষ সময়ের গোল হিসেবে নতুন রেকর্ডও গড়েছে। একই সঙ্গে নকআউট পর্বে নির্ধারিত সময়ের এত দেরিতে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও ফিরে এসে জয় পাওয়ার নজিরও প্রথমবার তৈরি করল বেলজিয়াম।

ম্যাচ শেষে বেলজিয়াম কোচ রুডি গার্সিয়া বলেন, ‘বিশ্বাস থাকলে ফুটবলে সবকিছুই সম্ভব। শুধু শুরুর একাদশ নয়, বেঞ্চের খেলোয়াড়রাও আমাদের দলের শক্তি। তারা নেমেই ম্যাচের চেহারা বদলে দিয়েছে।’

২০১৮ বিশ্বকাপেও জাপানের বিপক্ষে দুই গোল পিছিয়ে থেকে জয় পেয়েছিল বেলজিয়াম। সেই ম্যাচের চার তারকা থিবো কোর্তোয়া, রোমেলু লুকাকু, টমাস মুনিয়ের ও কেভিন ডি ব্রুইনা এবারও দলের হয়ে খেলেছেন। মুনিয়ের লুকাকুর গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন, আর কোর্তোয়া গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোলপোস্ট সামলেছেন। যদিও ডি ব্রুইনাকে ৫৮ মিনিটেই বদলি করা হয়, তবুও শেষ ষোলোতে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে তাকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবেই দেখছে দলটি।

ম্যাচে গোল করার পাশাপাশি নেতৃত্বের ভূমিকাও পালন করেছেন লুকাকু। দ্বিতীয়ার্ধে পানিবিরতির সময় টিলেমান্স ও ট্রোসার্ডের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হলে তিনিই পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।

সাবেক ইংল্যান্ড স্ট্রাইকার ডিওন ডাবলিন বলেন, ‘প্রথম ৭০ মিনিট সেনেগালই ভালো খেলেছে। কিন্তু লুকাকু মাঠে নামার পর ম্যাচের গতি পুরোপুরি বদলে যায়।’ পরে তিনি আরও বলেন, ‘তারা একে অপরের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। এমনকি কোচকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল।’

তবে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল বেলজিয়ামের পাওয়া পেনাল্টি। ভিএআর দেখে রেফারির নেওয়া এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাবেক ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল বলেন, ‘আমার সত্যিই মনে হয় না, এটি পেনাল্টি ছিল।’ আর রয় কিনের মতে, ‘সিদ্ধান্তটি কিছুটা কঠোর ছিল। রেফারি সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় নিয়েছেন।’

হারের পর হতাশা লুকাতে পারেননি সেনেগাল কোচ পাপে থিয়াও। তিনি বলেন, ‘এভাবে বিদায় নেওয়া খুব কষ্টের। ছেলেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। কিন্তু দুই গোলের লিড ধরে রাখতে পারিনি। এটাই ফুটবল, আমাদের এটি মেনে নিতে হবে।’

এদিকে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রও। বসনিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়েছে তারা। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ফোলারিন বালোগান গোল করে যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে দেন। পরে ৬৪ মিনিটে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেও ১০ জনের দল নিয়েই ৮২ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে দ্বিতীয় গোল করেন মালিক টিলম্যান। এই জয়ে শেষ ষোলোতে বেলজিয়ামের প্রতিপক্ষ হয়েছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র।

সেনেগালের বিপক্ষে রুদ্ধশ্বাস জয় দিয়ে আবারও প্রমাণ করেছে বেলজিয়াম— অভিজ্ঞতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার সামর্থ্যই এখনো তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০৩