রুপালি পর্দার আলো ঝলমলে জীবনে তিনি ছিলেন কোটি দর্শকের প্রিয় মুখ। অভিনয়ের জাদুতে কখনো ‘অনঙ্গ বউ’, কখনো ‘গোলাপী’, কখনো আবার সাধারণ বাঙালি নারীর আবেগ, ভালোবাসা আর সংগ্রামকে জীবন্ত করে তুলেছেন।


দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য পুরস্কার, সম্মান আর দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা। কিন্তু জীবনের এই সময়ে এসে তার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই নতুন কোনো সিনেমা, পুরস্কার কিংবা তারকাখ্যাতি। বরং তিনি স্বপ্ন দেখছেন এমন একটি কাজের, যা তাকে মানুষের দোয়ার সঙ্গে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখবে।


বেশ কয়েক বছর ধরেই একটি ইচ্ছা বুকে লালন করছেন ববিতা। সেই ইচ্ছা হলো, নিজের পৈতৃক ভিটায় একটি সুন্দর মসজিদ নির্মাণ করা। ববিতার দাদাবাড়ি যশোরের বিজয়নগরে। সেখানেই জড়িয়ে আছে তার শৈশবের অগণিত স্মৃতি। সম্প্রতি বড় বোন সুচন্দা ও ছোট বোন চম্পাকে নিয়ে যশোরে গিয়েছিলেন ববিতা। ববিতা বলেন, ‘এবার দাদাবাড়িতে গিয়ে মসজিদের জন্য জমি দেখে এসেছি। জমি চূড়ান্ত করে এসেছি। এতে আমার খুব শান্তি লাগছে। মনে হচ্ছে, সৃষ্টিকর্তা আমাকে একটি ভালো কাজ করার সুযোগ দিচ্ছেন। আমি খুব সুন্দর করে একটি মসজিদ নির্মাণ করতে চাই।’
 

তিনি বলেন, ‘একদিন তো সবাইকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। জন্ম হয়েছে, মৃত্যু একদিন হবেই। তাই চলে যাওয়ার আগে একটি ভালো কাজ করে যেতে চাই। খুব শিগগিরই মসজিদের নকশা করব। তারপর ধীরে ধীরে কাজ শুরু করব। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন।’

যশোর সফর ববিতার কাছে শুধু ভবিষ্যতের পরিকল্পনার নয়, অতীতের আবেগময় স্মৃতিরও এক দীর্ঘ ভ্রমণ হয়ে উঠেছিল। বিজয়নগরের দাদাবাড়ি আর বালিয়াচরের নানাবাড়ির প্রতিটি কোণ যেন তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে শৈশবে। কিন্তু সেই স্মৃতির ভিড়ে ছিল না অনেক পরিচিত মুখ। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কথা মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।

সবচেয়ে বেশি মনে পড়েছে তার শৈশবের বন্ধু কুলসুমকে। একসময় দুজনে একসঙ্গে মাছ ধরতে যেতেন, খেলতেন, ঘুরে বেড়াতেন। বহু বছর পর ফিরে গিয়ে জানতে পারেন, কুলসুম আর বেঁচে নেই। এই সংবাদ তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। স্মৃতির মানুষগুলো যে একে একে হারিয়ে যায়, সেই বাস্তবতা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে তার কাছে।
 

তবে সফরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা। দাদাবাড়ি ও নানাবাড়িতে খবর পেয়ে বহু মানুষ ছুটে এসেছেন শুধু একবার ববিতাকে দেখার জন্য। কেউ জড়িয়ে ধরেছেন, কেউ খোঁজ নিয়েছেন, কেউ আবার পুরোনো দিনের গল্প শুনিয়েছেন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য সম্মান পেলেও এই ভালোবাসার তুলনা হয় না বলে মনে করেন তিনি।

ববিতা বলেন, ‘দাদাবাড়ি ও নানাবাড়িতে যাওয়ার পর কত মানুষ যে এসেছেন! সবাই জড়িয়ে ধরেছেন, ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছেন। এই আনন্দ, এই শান্তি আর কোথায় পাব? কাছের মানুষের কাছে গেলেই এমন অনুভূতি পাওয়া যায়।’

এই সফরে আরেকটি স্মৃতি তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া বোন জেলির কবরেও গিয়েছিলেন তিনি। মাত্র চার বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া সেই বোনের কথা মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ববিতা। পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির পাশে শায়িত জেলির কবরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ভাবছিলেন, বেঁচে থাকলে আজ সেও হয়তো পরিবারের সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিত।
 

ব্যক্তিগত জীবনেও সামনে রয়েছে একটি বিশেষ দিন। আগামী ৩০ জুলাই তার জন্মদিন। প্রতি বছরের মতো এবারও জন্মদিন উদযাপন করবেন কানাডায়, একমাত্র ছেলে অনীকের সঙ্গে। ছেলে সেখানে চাকরি করেন। মা-ছেলের একসঙ্গে সময় কাটানোই এখন তার জন্মদিনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। ববিতা বলেন, ‘প্রায় প্রতি বছরই জন্মদিনটা ছেলের সঙ্গে কাটানোর চেষ্টা করি। এবারও তাই করব। খুব শিগগিরই কানাডায় যাব। তারপর মা-ছেলে মিলে সময় কাটাব। ছেলে কী পরিকল্পনা করেছে, সেটা এখনো জানি না। সেখানে গিয়েই জানতে পারব।’

জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে ববিতার চাওয়া খুব ছোট, কিন্তু তার অর্থ অনেক বড়। তিনি আর নতুন কোনো প্রাপ্তির হিসাব করেন না। জীবনের এই সময়ে এসে নিজের সবচেয়ে বড় চাওয়ার কথা জানাতে গিয়ে ববিতা বলেন, ‘এখন আমার একটাই স্বপ্ন—মসজিদটা করে যেতে চাই। নিজেকে ভালো কাজের সঙ্গে রাখতে চাই। আল্লাহ যেন আমাকে এই স্বপ্ন পূরণের তৌফিক দেন।’

হয়তো একদিন যশোরের সেই মসজিদে প্রতিদিন নামাজ আদায় করবেন অসংখ্য মানুষ। কেউ হয়তো জানবেন, এই ইবাদতখানার পেছনে রয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তি অভিনেত্রীর নীরব স্বপ্ন, নিজের জীবনের শেষবেলায় রেখে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দর উপহার। আর তখন ববিতার নাম শুধু চলচ্চিত্রের ইতিহাসেই নয়, মানুষের দোয়ার মধ্যেও বেঁচে থাকবে।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০৫