ছবি: সিলেট ভিউ গ্রাফিক্স।

সিলেট মহানগরীর মির্জাজাঙ্গালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত একটি প্রাইভেট হাসপাতাল। এই হাসপাতাল শুরুর পর থেকে নানান অভিযোগ উঠতে শুরু করে। হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ভূল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু, হাসপাতালে অনিয়ম, লেনদেনসহ নানা দুর্নীতি ও অবহেলার অভিযোগের শেষ নেই। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে যে সরকারি অনুমোদন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক যে লাইসেন্স থাকার কথা সেটা ছাড়াই হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে। আর এই অবৈধ হাসপাতালটি হচ্ছে সিলেট মহানগরীর মির্জাজাঙ্গাল এলাকায় অবস্থিত ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতাল।

 


সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের শেষের দিকে শুরু হওয়া এই হাসপাতাল শুরু থেকেই বিভিন্ন অপরাধ, অনিয়ম, দুর্নীতি আর ভূল চিকিৎসা রোগী মারা যাওয়ার অভিযোগ উঠতে শুরু করে। পাশাপাশি সরকারি অনুমোদন ও লাইসেন্স না থাকায় একাধিকবার জরিমানাও গুনতে হয়েছে এই ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতালকে। অযোগ্য বা প্রশিক্ষণহীন টেকনিশিয়ান ও চিকিৎসকদের দিয়ে চিকিৎসার কারণে বেশ কয়েকজন রোগীর (বিশেষ করে প্রসূতি মায়েদের) মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে। এমনকি ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন সময় সিলেটী ভাষায় কথা বলার কারণে রোগী ও তাদের স্বজনদের অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করা এবং হুমকি দিয়ে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, রোগীদের ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা না দিয়েই রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বিল ও মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

 

জানা যায়, সর্বশেষ সোমবার (২০ জুলাই) জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিহাব বিন আমিনের নেতৃত্বে পরিচালিত মোবাইল কোর্টের অভিযানে ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতাল সিলগালা করে দেওয়া হয়। এর আগে রবিবার (১৯ জুলাই) এক অভিযান চালিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।

 

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, রবিবার (১৯ জুলাই) বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতালে অভিযান দেয় জেলা প্রশাসন। এসময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল পরিচালনার বৈধ কোনো কাগজপত্র সরকারি অনুমোদন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক যে লাইসেন্স প্রশাসনকে দেখাতে পারে নি। তখন জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দপ্তরে লাইসেন্স ও বৈধ কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য ২৪ ঘন্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা দেখাতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে সোমবার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিহাব বিন আমিনের নেতৃত্বে পরিচালিত মোবাইল কোর্টের অভিযানে ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতাল সিলগালা করে দেওয়া হয়।

 

এর আগে ২০২৫ সালের ২২ জুলাই ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতালকে সিলগালা করেছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত। হাসপাতালটিকে আগেই নোটিশ দেওয়া হয়েছিলো। তবু তারা নবায়ন করেনি লাইসেন্স। পরবর্তীতে হাসপাতাল সিলগালা করে দু’দিনের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

 

একই বছরের ৩১ আগস্টে রবিবার দিবাগত রাতে ভুল চিকিৎসায় মাওলানা শফিকুর রহমান (৭৫) নামের এক ব্যাক্তির মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই রোগীর মৃত্যু ঘটনায় ওই সময়ে  হাসপাতালে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। নিহত মাওলানা শফিকুর রহমান গোলাপগঞ্জ উপজেলার চৌঘরি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মূত্রথলির পাথর অপারেশনের জন্য ওই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

 

রোগীর স্বজনরা অভিযোগ জানান, রবিবার (৩১ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টার দিকে তার অপারেশন শুরু হয়। রাত ৮ টার দিকে অপারেশন শেষ হলে রেস্টরুমে থাকাকালীন আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়। তারা জানান, শফিকুর রহমানের মৃত্যুর পরপরই দায়িত্বরত প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মনাফ হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে যান। ওই রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসকরা তাকে ভুলভাবে চিকিৎসা দেন। এতে তার অবস্থার অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

তারও আগে ২০২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতালে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠে। ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীদের জিম্মি করে সঠিক চিকিৎসা না দিয়ে দিনের পর দিন অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে।

 

ওই রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেন, সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার লাউড়েরগড় গ্রামের আলী আহসাব দেশের বিখ্যাত একজন নাগরী পুথি পাঠক। কিডনী জনিত অসুস্থ্যতা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় ভর্তি হন নগরীর সেফওয়ে হাসপাতালে। নর্থইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আব্দুল মনাফের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছিল। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ডা. আব্দুল মনাফ হাসপাতালের কেবিনে রোগীর স্বজনদের দেখে অকথ্যভাষায় গালমন্দ করেন। এ সময় জুতাপেটা করে তাদের বের করে দেয়ারও হুমকি দেন ডাক্তার মনাফ। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা না দিয়ে রোগীকে বের করে দেয়। তবে একদিনের ভাড়া ও চিকিৎসা বাবত ১০ হাজার হাতিয়ে নেয় হাসপাতালটি।

 

এর আগে হাসপাতাল শুরুর বছরে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে ওই হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় দুইজন প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ উঠে। ১৩ এপ্রিল (শুক্রবার) সকাল ৭টা ও সাড়ে ৭টায় পৃথক ভাবে এ ঘটনা দু’টি ঘটে বলে জানা গেছে।

 

নিহত দুই প্রসূতিরা হলেন, সিলেট সদর উপজেলার খাদিমপাড়া ইউনিয়নের কল্লগ্রামের শাখাওয়াত হোসেনের স্ত্রী আসমা বেগম (২৪) ও জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট ইউনিয়নের চুনাহাটি গ্রামের রুবেল আহমদের স্ত্রী ফয়জুন্নাহার চৈতি (২২)।

 

নিহত ফয়জুন নাহারের স্বামী রুবেল আহমদ অভিযোগ করে বলেন, রাতে ডা. মিনতি সিনহা আমার স্ত্রীর অস্ত্রোপচার করেন। তার একটি পুত্র সন্তান হয়। সকাল ৭টার দিকে তার স্ত্রীর অবস্থা খারাপ হলে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. আশরাফ এসে ইনজেকশন পুষ করার পর রোগীর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তখন কর্তব্যরত চিকিৎসক আইসিইউ সাপোর্টে নেওয়ার কথা বলেন। এরপর নগরীর রাগিব রাবেয়া হাসপাতালে নেওয়া হলে ওই হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেন, রোগী অনেক আগেই মারা গেছেন।

 

রোগী মারা যাওয়ার পর বিল না রেখেই রোগী বিদায় করে দেওয়ার চেষ্টা করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, এমন অভিযোগও করেন তিনি।

 

এদিকে নিহত আসমা বেগমের ভাই কাইয়ুম আল রনি বলেন, বোনের প্রসব বেদনা ওঠার আগেই রাতে ডা. মিনতি সিনহা অস্ত্রোপচার করেন। সিজারে একটি কন্যা সন্তান হয়। এরপরই একজন নবীন চিকিৎসকের তত্বাবধানে আমার বোনকে রেখে যান ওই চিকিৎসক। সকালে রোগীর অবস্থা স্বাভাবিক থাকলেও একটি ইনজেকশন দেওয়ার পর তার বোন মারা যায়। ভুল চিকিৎসায় তার বোন মারা গেছেন বলেই বারবার দাবি করছেন কাইয়ুম।

 

এদিকে মৃত দুই প্রসূতির স্বজনরা বলছেন, রোগীর অবস্থার অবনতি হওয়ার পর চিকিৎসকদের খোঁজ মেলেনি। তারা হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে যান। এমনকি কথা বলার মতো হাসপাতালের কোন কর্তৃপক্ষকেও পাওয়া যাচ্ছে না।

 

অভিযান দিয়ে জরিমানা ও হাসপাতাল সিলগালার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার মো. তানভীর হোসেন সজিব। তিনি জানান, এর আগে এই হাসপাতালকে ১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা তা তোয়াক্কা না করে হাসপাতালের কার্যক্রম চালিয়ে যান। পরবর্তীতে অভিযান দিয়ে হাসপাতালকে সিলগালা করা হয়।

 

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া-০৯