বর্ষা এলেই হাওরে সাগরের রূপ ধারণ করে এবং চারদিকে খেলা করে অথৈ জল। জনজীবন হয়ে যায় পানি বন্দী। ফলে এখানকার মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে যায় একমাত্র নৌকা। তবু থেমে থাকে নি কোমলমতি শিশুদের শিক্ষার অদম্য স্পৃহা। মাথার উপর তীব্র ঝড়-বৃষ্টি, বজ্রপাতের আশঙ্কা ও উত্তাল ঢেউয়ের মতো ভয়ংকর পরিস্থিতি উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করছে তাদের লালিত স্বপ্ন পূরণে।

বলছি সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলার হাওরাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিশুদের কথা। যোগাযোগের বিকল্প রাস্তা না থাকায় শাল্লার ১০৭ টি স্কুলের মধ্যে শান্তিপুর, যাত্রাপুর, ইয়ারাবাদসহ বেশ কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য একমাত্র ভরসা ছোট ছোট ভাঙ্গাচোরা ডিঙি নৌকা। প্রবল স্রোতে ধারণক্ষমতার বেশি শিশুদের নিয়ে ছোটে চলা এই ডিঙি নৌকা হালকা বাতাস বা বড় নৌকার ঢেউয়ে যেকোনো মুহূর্তে দূর্ঘটনায় কবলিত হতে পারে। কিন্তু শিশুদের জন্য নেই কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা।
 


এই প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করে থাকে।

সরেজমিনে বিভিন্ন স্কুল পরিদর্শন করে এমনই দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।

এ বিষয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, বর্ষাকালে ছোট নৌকায় আমরার স্কুলে আইতে ভয় লাগে। অনেক দিন বৃষ্টিতে ব্যাগ ভিজে যায়, ঠান্ডায় সর্দি জ্বরও আয়, ঠাডা পড়ে আবার ঢেউয়ে নৌকা ডুইব্যাও যায় এমন অবস্থা। দিন খারাপ করলে ঠিকমতে স্কুলে আইতাম পারি না। পড়ালেখার ক্ষতি হয়। যদি আমরার জন্য স্কুল থেকে ভাল নৌকা দিত তাহলে সুন্দর করে স্কুলে আইতাম কোনো ভয় থাকতনা। আমরার লাগি বাবা-মা ও স্যার-ম্যাডাম সবাই চিন্তা করে।

শিক্ষার্থী অভিভাবক বির্বল দাস ও সাইকুল মিয়া বলেন, “আমাদের গ্রাম থেকে স্কুলটা হাওরে ঐখানে বর্ষায় যাতায়াত করার মতো কোনো রাস্তা নেই। আমাদের গ্রামের একজন লোককে তার ছোট ডিঙ্গি নৌকা দিয়ে মজুরির বিনিময়ে বাচ্চাদের স্কুলে আসা যাওয়া করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিদিন বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে আমরা ভয়ে থাকি, যতক্ষণ না পর্যন্ত স্কুল থেকে বাচ্চারা বাড়িতে আসে। কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যতের দিক তাকিয়ে এই বুক কাঁপানো ভয়কে মেনে নিতে বাধ্য হই।”

শিক্ষার্থী পরিবহনকারী নৌকা চালক সাদির মিয়া ও পডই দাস বলেন, “বাইস্যা মাস পোলাপানরে লইয়া স্কুলে আসা যাওয়া করি। এরার মা বাপে কইয়া দেয় যাতে সমিস্যা না অয়। এত ঢালার (স্রোত) মাইঝে নাও বাইয়া যাই, হঠাৎ মেঘ আয়, ঢাডা (বজ্রপাত) পড়ে, ঢেউয়ে নাও লড়ে, এসময় নিজেরই ডর (ভয়) লাগে। এরপরেও চেষ্টা করি তাদের ভালামতে পৌঁছাইতে।”
 

যাত্রাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) অপর্না রাণী দাস বলেন, “আমার এই স্কুলে ৫টি পাড়ার শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে। হাওরের বাচ্চারা অত্যন্ত মেধাবী এবং তারা স্কুলের প্রতি অনেক আগ্রহ। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে তারা চরম ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে আসতে হয়। হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ করলে ওরা খুব ভয় পায়। অনেক সময় বৃষ্টিতে তাদের স্কুল সামগ্রী ভিজে যায় এমনকি অনেকেই ঠান্ডা লেগে অসুস্থ হয়। বৃষ্টি হলেই বজ্রপাত শুরু হয়। আসলে তাদের জন্য আমরাও খুব টেনশন করি। এই এলাকায় নৌকা ডুবিতে অনেকেই মারা গেছেন। হাওরে প্রচুর স্রোত থাকে, বড় ঢেউ হয় যেমন কিছুদিন আগে আমাদের এক শিক্ষার্থী স্কুলে আসার পথে ঢেউয়ে নৌকা হাওরের মধ্যে নিয়ে যায়। পরে বড় নৌকা নিয়ে তাকে উদ্ধার করা হয়। যদি আবহাওয়া খারাপ করে শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসতে দেয় না অভিভাবকরা। এতে পড়ালেখায় অনেক ক্ষতি হয়। বিশেষ করে সরকার এসব স্কুলে ভাল নৌকার ব্যবস্থা সহ অন্তত প্রতিটি বাচ্চার জন্য লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা করলে তাদের জীবন কিছুটা হলেও ঝুঁকি মুক্ত হতো।”

এমনটাই বলেছেন, শান্তিপুর ও ইয়ারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পল্লবী রাণী তালুকদার ও আব্দুল হামিদ সহ আরো অনেকেই।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পরিমল চন্দ্র ঘোষ বলেন, “শাল্লা উপজেলার বেশ কিছু প্রাইমারি স্কুল হাওরের মধ্যে অবস্থিত। এখানকার শিক্ষক শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে আসা যাওয়া করে। এর মধ্যে অনেকেই সাঁতার জানে না। আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করব শিক্ষক শিক্ষার্থীরা স্কুলে নির্বিঘ্নে যাতায়াতের জন্য যেন ভাল মানের নৌকা ব্যবস্থা করা হয়।”

জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার পিয়াস চন্দ্র দাস জানান, “শাল্লা একটি হাওর বেষ্টিত অঞ্চল, এখানে বর্ষাকালে কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে যেখানে ছাত্রছাত্রীরা অনেক কষ্ট করে নৌকার মাধ্যমে স্কুলে যাওয়া আসা করতে হয়। আমার জায়গা থেকে কোমলমতি শিশুরা স্কুলে আসা যাওয়ার করার জন্য যাতে ঝুঁকিমুক্ত সুন্দর ব্যবস্থা করা হয় এজন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব।”
 

প্রকৃতির সাথে লড়াই করে হাওরের এই শিশুরা শিক্ষার আলো পেতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতি বছর এই বর্ষা মৌসুমে কতদিন আর এভাবে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তাদের স্কুলযাত্রা করতে হবে? শিশুদের এই অদম্য ইচ্ছাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং তাদের জীবন সুরক্ষিত রেখে স্কুলে যাতায়াতের জন্য এখনই প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ এমনটাই প্রত্যাশা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।


 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/সন্দীপন/এসডি-২২