ছবি: এআই।
সিলেট নগরীর ব্যস্ততম এলাকা মির্জাজাঙ্গালে অবস্থান সেফওয়ে হাসপাতালের। লাইসেন্স নবায়ন না করেই প্রায় দশবছর ধরে হাসপাতালটি অবৈধভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এই সময়ের মধ্যে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ ওঠেছে কয়েকবার। প্রশাসনের অভিযানে হাসপাতালটি কয়েকবার সিলগালাও হয়েছে। কিন্তু কোন কিছুতেই হাসপাতালটির অবৈধ কার্যক্রম থামেনি।
এছাড়া সিলেটে এরকম অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে যারা লাইসেন্স নেওয়ার প্রয়োজনই মনে করেনি। লাইসেন্স ছাড়াই তারা চালিয়ে যাচ্ছে দেদার চিকিৎসা বাণিজ্য। তবে, এবার তালিকা করে এসব অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিকের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। এখন থেকে সিলেটে অবৈধভাবে কোন হাসপাতাল-ক্লিনিকের কার্যক্রম চলতে দেওয়া হবে না বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন সিভিল সার্জন মো. নাসির উদ্দিন।
সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে অন্তত ৩৫টি অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এদের বেশিরভাগই লাইসেন্স নিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও পরবর্তীতে নবায়ন করেননি। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বার বার নির্দেশ দেওয়া হলেও লাইসেন্স নবায়ন না করেই তারা বছরের পর বছর চিকিৎসা বাণিজ্য চালিয়ে আসছে। লাইসেন্স নেওয়ার পর শর্ত লঙ্ঘন এবং নবায়ন ফি না দিতেই তারা অবৈধভাবে হাসপাতালগুলো পরিচালনা করছেন। এসব হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা প্রায়ই ভুল চিকিৎসা ও প্রতারণার শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাঝে মধ্যে ভুল চিকিৎসা নিয়ে হুলস্থল কাণ্ড ঘটলে প্রশাসন কিছুটা নড়েচড়ে বসে। কিন্তু এর উত্তাপ খুব বেশি দূর গড়ায় না। ভূক্তভোগীদের সাথে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আপোসরফা করে নেন। তবে সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে জেলা ও মহানগরে অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা ৩৫ হলেও বাস্তবে এরকম প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক বেশি। সিভিল সার্জন অফিসে লাইসেন্স নবায়ন না করা প্রতিষ্ঠানের তালিকা থাকলেও লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণ হিসেব তাদের কাছে নেই। লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা সরকারি অফিসে না থাকায় তারা অনেকটা নিরাপদে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চলতি জুলাই মাসের শুরুতে সিলেটের অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অফিস। এর আলোকে গত ৭ জুলাই অবৈধভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর মধ্যে ১৪টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবরে চিঠি পাঠান সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম। ওই চিঠিতে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক উল্লেখ করেন, লাইসেন্স হালনাগাদ নবায়ন না করে স্বাস্থ্য সেবা পরিচালনা করে যাওয়া বাংরাদেশ মেডিকেল প্র্যাকটিস ও প্রাইভেট ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিনেন্স ১৯৮২ এর ধারা-০৮ অনুযায়ী অসম্পূর্ণ অবৈধ।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দেওয়া তালিকায় যেসব অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নাম ছিল সেগুলো হচ্ছে- নগরীর চৌহাট্টাস্থ সেন্ট্রাল হাসপাতাল, মীরের ময়দানের ফেয়ার হেলথ হসপিটাল, মানিকপীর রোডের লায়ন্স শিশু হাসপাতাল, সুবিদবাজারের মডার্ন জেনারেল হসপিটাল, মধুশহীদের আরোগ্য পলি ক্লিনিক, উপশহরের আল আমিন জেনারেল হাসপাতাল, মির্জাজাঙ্গালের সেইফওয়ে হাসপাতাল, নবাবরোডের নিরাময় পলি ক্লিনিক, মিরবক্সটুলার ডেল্টা স্পেশালাইজড হাসপাতাল, লামাবাজারের মেট্রো মেডিকেয়ার ক্লিনিক, কাজিটুলার কেয়ার হসপিটাল, আম্বরখানার সুরমা ভ্যালী হাসপাতাল, শিবগঞ্জের সিলেট ফেক্সো সেন্টার এবং টুকেরবাজার তেমুখী পয়েন্টের সিলেট মডেল চক্ষু হাসপাতাল ও ফ্যাকো সেন্টার।
এর মধ্যে সিলেট ফেক্সো সেন্টার ও সিলেট মডেল চক্ষু হাসপাতাল ও ফ্যাকো সেন্টার লাইসেন্স ছাড়াই চক্ষুসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আর বাকিগুলো লাইসেন্স গ্রহণ করলেও পরে নবায়ন করেনি। এই ১৪টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ছাড়াও মহানগরীতে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। ধাপে ধাপে অবৈধ সকল হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এদিকে, সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য অনুযায়ী জেলায় যেসব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে তার মধ্যে রয়েছে- সিলেট সদর উপজেলার সাহেবের বাজারের বান্ধব স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র, টুকেরবাজার, দক্ষিণ সুরমা ও ওসমানীনগরস্থ সূর্যের হাসি ক্লিনিক, বিয়ানীবাজারের চারখাই মেটারনিটি ক্লিনিক এন্ড কনসালটেশন সেন্টার, বিয়ানীবাজারের মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতাল।
অবৈধ হাসপাতালগুলোর মধ্যে যাত্রা শুরুর পর লাইসেন্স নবায়ন করেনি সেফওয়ে হাসপাতাল। ২০১৮-১৯ সাল থেকে অবৈধভাবে হাসপাতালটি পরিচালিত হয়ে আসছে। সর্বশেষ গত ২০ জুলাই প্রশাসন অভিযান চালিয়ে হাসপাতালটিকে জরিমানা ও সিলগালা করে। এছাড়াও সম্প্রতি অভিযান চালিয়ে লাইসেন্স নবায়ন না করায় মহানগরীর সেন্ট্রাল হাসপাতাল, সুরমা ভ্যালী হাসপাতাল ও আল বারাকা চক্ষু হাসপাতাল কয়েকটি হাসপাতাল ও ক্লিনিককে জরিমানা করা হয়েছে। লাইসেন্স নবায়নের জন্য তাদেরকে ১৫ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন জানান, অনেক প্রতিষ্ঠানকে বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও তারা লাইসেন্স নবায়ন করেন না। লাইসেন্স নবায়ন না করায় বৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো এখন অবৈধের তালিকায় ওঠেছে। তালিকা করে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। যারা ২০১৯-২০২০ সাল থেকে অবৈধ এদের দিয়ে অভিযান শুরু হয়েছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া-১০




