ছবি: সংগৃহিত

সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে সংঘটিত শ্রমিক হত্যার ঘটনায় পৃথক মামলা হয়েছে। এরমধ্যে বাসের হেলপার রিপন হত্যার সঙ্গে জড়িত চার আসামিকে অব্যহতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

 


শনিবার (১ আগস্ট) বিকেলে সিলেট জেলা প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেছেন নিহত বাস শ্রমিক রিপন আহমদের বাবা ছাবলু মিয়া।

 

তিনি মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

 

সংবাদ সম্মেলনে ছাবলু মিয়া বলেন, গত ২৭ এপ্রিল দুপুর থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দক্ষিণ সুরমার কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে সংঘটিত সশস্ত্র হামলায় তার ছেলে রিপন আহমদ (৩০) ও বাসচালক দেলওয়ার হোসেন গুরুতর আহত হন। রিপন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ মে মারা যান। পরে ৭ মে মারা যান বাসচালক দেলওয়ার হোসেন (৪০)। হামলায় আরও কয়েকজন শ্রমিক আহত হওয়ার পাশাপাশি মালিক সমিতির কার্যালয়, বিভিন্ন বাস কাউন্টার ও একাধিক বাসে ভাঙচুর চালিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা হয়।

 

তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনাটি গণমাধ্যমে সংঘর্ষ হিসেবে প্রচারিত হলেও বাস্তবে এটি ছিল পরিকল্পিত ও একতরফা হামলা। হামলার নেপথ্যে সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলাম ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজন ছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।

 

নিহতের বাবা বলেন, তার ছেলে রিপন একজন বাস হেলপার ছিলেন। সদ্য বিবাহিত রিপনের স্ত্রী বর্তমানে সন্তানসম্ভবা। জীবিকার তাগিদে কর্মস্থলে গেলে তার উপার্জনক্ষম ছেলেকে পিটিয়ে-কুপিয়ে খুন করা হয়। তাকে হারিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

 

তিনি বলেন, ছেলের দাফন শেষে দক্ষিণ সুরমা থানায় ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলাম ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজনকে প্রধান আসামি করা হয়।

 

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, মামলার তদন্তে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও এজাহারভুক্ত প্রধান দুই আসামিকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। বরং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দক্ষিণ সুরমা থানার এসআই মফিজুর রহমান গত ১১ জুন আদালতে চারজন আসামির অব্যাহতি চেয়ে আগাম প্রতিবেদন দাখিল করেন। অব্যাহতির সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে ময়নুল ইসলাম ও আলী আকবর রাজনের নামও রয়েছে।

 

ছাবলু মিয়া বলেন, তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগেই আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে, যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ বিষয়ে গত ২ জুলাই পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো প্রতিকার পাননি। তিনি আদালতে নারাজি আবেদন করবেন বলেও জানান।

 

তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ সুরমার থানায় অভিযোগ নিয়ে গেলে ওসি ময়নুল-রাজনসহ কয়েকজনের নাম বাদ দিতে বলেন। তিনি তাতে রাজি হননি। পরে তিনি ওসি ও তদন্ত অফিসারকে ফোন দিলেও কোনোদিন ফোন ধরেননি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মফিজুর রহমান আসামিদের বাদ দিয়ে আদালতে আগাম প্রতিবেদন দিলেও আমাকে অবগত করেননি। পরে আইনজীবীর মাধ্যমে জানতে পারি।

 

মামলার আসামিরা রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রভাব ব্যবহার করে তদন্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। মূলত; কদমতলী বাস টার্মিনালে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ চলছিল। এরই জেরে তার ছেলে ও বাসচালক দেলওয়ার হোসেন হত্যার শিকার হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।

 

ছাবলু মিয়া আরও বলেন, আমার ছেলে মারা যাওয়ার পর তার সংগঠন থেকে দাফন-কাফনের টাকাও দেওয়া হয়নি। ছেলেকে হারিয়ে আমি পাগল প্রায়। এই ছেলে আমাকে খাওয়াতো। যেদিন হামলার শিকার হয়, সেদিনও আমাকে ১৫শ’ টাকা দিয়ে এসেছে, যা ভাললাগে এনে খাওয়ার জন্য। আমার মুখে আহার তুলে দেওয়া সেই ছেলেকে খুনীরা কেড়ে নিয়েছে। আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। সেই সাথে মারা যাওয়া বাসের চালক দেলওয়ার হত্যাকারীদেরও বিচার হোক। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে এবং প্রকৃত অপরাধীরা যেন বিচারের মুখোমুখি হয়—এটাই আমার একমাত্র দাবি।

 

উল্লেখ্য,গত ২৭ এপ্রিল বেলা ২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত দক্ষিণ সুরমার কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে সশস্ত্র হামলায় দুই শ্রমিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের একজন আমার ছেলে রিপন আহমদ (৩০)। নিহত ওপরজন বাস বাস দেলওয়ার হোসেন। এই ঘটনায় আরও কয়েকজন শ্রমিক আহত হন। হামলাকারীরা ওই দিন মালিক সমিতির অফিস, বিভিন্ন বাস কাউন্টার ও বেশ কয়েকটি বাস ভাঙচুর করে লাখ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করে। আর এই পুরো ঘটনাই ঘটেছে সিলেট জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ও যুগ্ম সম্পাদক আলী আকবর রাজনের মদদে, দাবি বাদি পক্ষের। তাদের  নির্দেশেই  আন্তঃজেলা মিতালি পরিবহণ ও হবিগঞ্জ এক্সপ্রেসসহ ঢাকাইয়া বাসের বিভিন্ন শাখার শ্রমিক ও কতিপয় লোকাল শ্রমিকরা একতরফা হামলার ঘটনা ঘটায়। এতে জকিগঞ্জ রুটের বাসের হেলপার রিপন আহমদ ও বাস চালক দেলওয়ার হোসেনকে গুরুতর আহত হন। ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২ মে রিপন আহমদ মৃত্যু বরণ করে। পরে ৭ মে মারা যান বাস চালক দেলওয়ার হোসেন (৪০)। নিহত রিপন আহমদ গোলাপগঞ্জ উপজেলার উত্তর রণকেলি গ্রামের বাসিন্দা সাবলু মিয়ার ছেলে এবং দেলওয়ার হোসেন (৪০) বিয়ানীবাজারের চারখাই বাঘবাড়ি এলাকার আজির উদ্দিনের ছেলে।

 

তিনি জকিগঞ্জ রুটের বাস চালক ছিলেন।

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/ইকে