সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে জুন ও জুলাই মাসের বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন গ্রাহকেরা।
অনেকেই দাবি করছেন, আগের তুলনায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিল দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এমনকি কয়েকজন গ্রাহক স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল পাওয়ার অভিযোগও করেছেন।
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগে গ্রাহকদের প্রতিবাদ ও স্মারকলিপি দেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। গ্রাহকদের একাংশের দাবি, নিয়মিত লোডশেডিংয়ের মধ্যেও বিদ্যুৎ বিল বাড়ায় বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত ফেসবুকে প্রশ্ন করেন, ‘এ মাসে কি আপনার বাসার মিটারে বিদ্যুতের বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে?’
তার পোস্টের মন্তব্যে মিনারুল ইসলাম বাপ্পা নামে একজন লিখেছেন, ‘আগে আসতো ৫০০-৭০০ এর ভিতর৷ গত দুই-তিনমাস থেকে ১৫০০-১৮০০ এর ভিতর আসতেছে। তার দাবি, ‘কারেন্টের (বিদ্যুতের) ব্যবহার আগের মতই আছে৷’
সাব্বির আহমেদ নামে আরেকজন জানান, গত দুই-তিন মাস ধরে তার বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিক বেশি আসছে। ‘তিনগুণ বেশি এসেছে’ জানিয়ে ডালিম হাজারী নামে একজন লিখেছেন, ‘গ্যাস নেই, কারেন্ট (বিদ্যুৎ) আসে যায়, কাঁচামরিচের কেজি ৪০০ ছাড়িয়ে- সেই এক সুখের জীবন।’
ওয়াহিদ আশরাফ নামে একজন গ্রাহক অভিযোগ করে বলেন, ‘জুন মাসে বিলের হিসেব কম করে দেখানোর জন্য ডেসকো গত মাসের প্রকৃত ইউনিট না ধরে সকল মিটারের ইউনিট কম দেখিয়ে বিল করেছিল। এই মাসে নতুন রেটের বৃদ্ধি আর গত মাসের কমিয়ে দেয়া ইউনিট মিলে বিরাট বিল হবে বলে অপেক্ষা করছি। আমাকে গত মাসে বিল দেয় ১৯ তারিখে। আমি তখনই বিষয়টা উল্লেখ করে পোস্ট দিয়েছিলাম।’
তিনি জানান, নিয়মিত মিটার রিডারের সময় মিটারের ছবি তুলে রাখেন এবং তার কাছে আগের রিডিংয়ের তথ্যও রয়েছে।
প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের মধ্যেও একই ধরনের অভিযোগ দেখা গেছে। জাবেদ বিন নূর লেখেন, ‘আগে ২০০০ রিচার্জ করলে মাস চলে যাইতো, এখন ৪০০০ করলেও মাসের আগেই ব্যালেন্স শেষ হয়ে যায়।’
তাহসিন মর্তুজা নামে একজন লিখেছেন, ‘আমার বাসার জুন মাসের কারেন্ট বিল ছিল ১০ হাজার সামথিং! অথচ আমরা সেই মাসে হাফ মাস ছিলাম গ্ৰামে এসি চালানো তো দূরের কথা একটা লাইট ও জ্বালিয়ে যাইনি! এর আগের মাংসগুলোতে এসি ওয়াসিং মেশিন, দুইটা ফ্রিজ থাকা অবস্থায়ও এত বিল আসেনি! আমি অভিযোগ করলে বলা হয় জুন মাস বাজেটের মাস, তাই বলে অর্ধেক মাস কোন কারেন্ট খরচ না করেও এত বিল?’
লাবীবা নামে একজন লেখেন, ‘আমাদের ৭০০ টাকার বিল লিটারেলি ১৫০০ এসেছে। আমাদের ইউনিট খরচ ও বেশি দেখিয়েছে৷ অথচ আমরা চাকরিজীবী মানুষ আমাদের ব্যবহার ঠিক আগের মতোই আছে। আমরা বাসা থেকে সকাল ৮ টায় বের হয় ঘরে ফিরি ৫টায়।’ তার দাবি, বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করে ইউনিট বেশি দেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলেও আশানুরূপ কোনো উত্তর পাননি।
হুমায়রা নূর লিখেছেন, ‘২/৩ হাজার টাকা বিল আসে, সেই বিল এসেছে ২৮ হাজার, প্রমাণসহ পোস্ট করব।’
সাইয়্যেদ সুফিয়ান বলেন, ‘জুনের বিল ৩ গুণ বেশি আসছিল। অথচ আমার জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত গড় ইউনিট ছিল ৪১ ইউনিট আর শুধু জুন মাসেই সেটা ১৫২ ইউনিট। কোনোভাবেই হিসাব মিলেনা কেমনে কি!’
নুর আলম আমানত নামে একজন লিখেছেন, ‘সাধারণ জনগণ দিনে গড়ে যত ঘণ্টা করে কারেন্ট (বিদ্যুৎ), গ্যাস পাচ্ছে; সংসদ সদস্য যারা আছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান থেকে শুরু করে প্রত্যেকের বাসায়ও ঠিক ততো ঘণ্টা কারেন্ট, গ্যাস সচল রাখা এখন সময়ের দাবি। জনগণ বাজে সিস্টেমের ফাঁদে পরে অতিষ্ট হয়ে যাবে, আর জনগণের চাকররা এলিট লাইফ লিড করবে এটা হতে পারে না।’
এদিকে, আবু মুনাওয়ার নামে একজন লিখেছেন, ‘হঠাৎই আম্মু বলছে মিটার নষ্ট হয়ে গেছে। বিল ভুল দেখাচ্ছে। পরে খবর নিয়ে জানলাম এটা নাকি বর্তমান বিদ্যুৎ বিল।’
রাকিব উদ্দীন বলেন, ‘মাসিক বিল আসতো ৩০০+ অথচ জুনে আসছে ৬৫০+। জুলাইয়ে আসছে ১০০০ টাকা!’ মাসুদ রানা মিরাজ লেখেন, ‘আগে দিতাম ১ হাজার গত জুলাইয়ে দিলাম ৩ হাজার বাহ।’
ইউসুফ মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ লেখেন, ‘পোস্টপেইডে বিল ২-৩ হাজারের নিচে আসতেসে নাহ। আগে আসতো ১২০০-১৬০০। তাওও মিটারে আরও বেশি রিডিং দেখাচ্ছে। এমন রিডিং দেখাচ্ছে যেটা আগামী দুইমাসেও কাভার করতে মুশকিল হয়ে যাবে। দুইটা ফাইন্ড আউট আছে- ১. আগের বছর খানেক অন্তত মিটার না দেখেই বিল ধরিয়ে দিসে। ২. মিটারে কোনো কারসাজি করে অভিযোগ প্রদানের সময়ে নষ্ট হয়ে গেছে দাবি করে গ্রাহকের নিজ খরচে প্রিপেইড মিটারে কনভার্ট করার ধান্দাবাজি চলতেসে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও ফেসবুকে জানতে চান, কারও বাসার বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে কি না। তার পোস্টের মন্তব্যে মুয়াজ আল বুখারী নামে একজন জানান, তার বিল দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। আহমেদ মুজাক্কির নামে একজন মন্তব্য করেন, বিল দেখে মনে হচ্ছে যেন কেউ ‘নিজ হাতে টাকার অঙ্ক বসিয়ে দিয়েছে’।
আরিফা আক্তার নামে একজন অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ বিল প্রায় তিন গুণ বাড়লেও সরবরাহ আগের তুলনায় কমেছে। তার দাবি, আগে দিনে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর যে বিল আসত, এখন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টাও ঠিকমতো বিদ্যুৎ না থাকার পরও বিল তিন গুণ এসেছে।
আরজে রাসেল আহমেদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিল বেশি এটাও আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যানের অংশ।’
এমজি রাব্বি ইসলাম নামে একজন জানান, তার বাসায় এসি, ফ্রিজ, রাইস কুকার, ফ্যান, লাইট ও ইন্ডাকশন চুলা ব্যবহার করেও সাধারণত মাসে প্রায় ৫ হাজার টাকার মতো বিদ্যুৎ বিল আসত। কিন্তু এবার বিল ১০ হাজার টাকার বেশি হয়েছে বলে দাবি তার।
মো. মোস্তাফিজুর রহমান লেখেন, ‘কয়দিন পরে দেখবেন খাম্বা আছে তার নাই... সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিদ্যুৎ পাওয়াটা এ সময়ে বিলাসিতা...।’
সাইজুল আমিন নামে একজনের পোস্টেও বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। তার দাবি, প্রিপেইড ও পোস্টপেইড—দুই ধরনের মিটার ব্যবহারকারীরাই একই ধরনের সমস্যার কথা জানাচ্ছেন। তিনি পোস্টে লেখেন, ‘দেখেন বিদ্যুৎ বিষয়টা আসলেই স্ক্যাম করতেছে সরকার। নতুন প্রিপেইড, পোস্টপেইড সব মিটারে সেইম সমস্যা। এক লোক পোস্ট করছে তার প্রতি মাসে ৭-৮ হাজার টাকা বিল আসতো। তার বাসাভাড়া ৩০-৩৫ হাজার টাকা। কিন্তু এবার তার বিল আসছে ৪০ হাজার টাকার বেশি। মানে বাসাভাড়া থেকে কারেন্ট বিল বেশি। এই ব্যাপার নিয়ে উক্ত ব্যক্তি বিদ্যুৎ অফিসে গেলে তাকে ১০ হাজার টাকা বিল কমিয়ে দেয়। কথা হলো সে যদি ৪০ হাজার টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার করে থাকে তাহলে তুই ১০ হাজার টাকা কমানোর কে? তার বিদ্যুৎ বিল তুই ভরে দিবি? ১০ হাজার টাকা বেশি আসলো কেন সেটা এখন কমানো লাগলো কেন? কারণ কি?’
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এসব অভিযোগের মধ্যে বিদ্যুৎ বিল দ্বিগুণ, তিন গুণ কিংবা তারও বেশি হওয়ার দাবি যেমন রয়েছে, তেমনি মিটার রিডিং, ইউনিট হিসাব এবং বিল তৈরির পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন গ্রাহকেরা। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-১৪




