২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সারা দেশের মতো উত্তাল সিলেট। শেখ হাসিনার পতনের একদফা দাবিতে রাজপথে ছাত্র-জনতার অনড় অবস্থান। একদিকে, পুলিশ, বিজিবি ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী, অন্যদিকে আন্দোলনকারী। থমথমে এই পরিস্থিতিতে সেদিন রক্তের নহর বয়েছিল সিলেটের গোলাপগঞ্জে। গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান আন্দোলনকারী ৬ জন।
৫ আগস্ট সরকার পতনের পর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পৃথক মামলা হয়। কিন্তু দুই বছর পার হলেও এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। মামলার তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা, বিচার শুরু না হওয়া ও প্রধান আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর ঘটনায় এখন বিচার নিয়ে শঙ্কিত শহীদ পরিবারগুলো। তবে পুলিশ বলছে, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে, শিগগিরই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে সরকার পতনের একদফা কর্মসূচি পালনের লক্ষ্যে গোলাপগঞ্জের ঢাকাদক্ষিণ বাজারে ছাত্র-জনতা মিছিল বের করে। এসময় পুলিশ ও বিজিবির সাথে সংঘর্ষ বাধে। প্রায় ৩ ঘন্টা ধরে চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ছাত্র-জনতা ধাওয়া দিয়ে পুলিশকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে নিয়ে আসে। এসময় পুলিশ ও বিজিবি মিলে গুলি ছুঁড়ে।
এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান উপজেলার ধারাবহর গ্রামের মো. মকবুল আলীর ছেলে ব্যবসায়ী তাজ উদ্দিন (৪৩), শিলঘাটের বাসিন্দা সানি আহমদ (১৮), নিশ্চিন্তপুর গ্রামের তৈয়ব আলীর ছেলে নজমুল ইসলাম (২২) ও ঢাকাদক্ষিণ রায়গড় গ্রামের ছুরুই মিয়ার ছেলে হাসান আহমদ (২০)।
ওইদিন বিকেল ৩টার দিকে গোলাপগঞ্জ পৌরশহরে ফের মিছিল বের করে ছাত্র-জনতা। এসময় আবারও পুলিশ-বিজিবির সাথে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষ বাধে। পুলিশ-বিজিবি গুলি ছুঁড়লে বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান পৌর এলাকার ঘোষগাঁও গ্রামের মৃত মোবারক আলীর ছেলে গউছ উদ্দিন (২৯) ও তরাইল গ্রামের আলাদ্দিনের ছেলে মিনহাজ আহমদ (২৬)।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়েরের পর কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করা হয়। হত্যাকাণ্ডের দুইবছর পার হয়ে গেলেও এখনো ৬ মামলার কোনটিরও তদন্ত শেষ হয়নি।
নিহত নাজমুল ইসলামের ভাই সাইফুল ইসলাম জানান, তিনি ও তার ভাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। পুলিশ, বিজিবি ও হেলমেটধারী লোকজন বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে। এসময় সামনে থাকা দুই শিশুকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন নাজমুল। দ্বিতীয় শিশুকে সরিয়ে নেওয়ার সময় তার গলার বাম পাশে গুলি লাগলে তিনি মারা যান। দুই বছরেও মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
নিহত মিনহাজ আহমদের ভাই সাঈদ আহমদ জানান, ৪ আগস্ট গুলিবিদ্ধ হলে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু হাসপাতালে লাশ আটকে রাখা হয়। শেখ হাসিনার পতনের পর লাশ পেয়েছি। মিনহাজের পেটের এক পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অন্যপাশ দিয়ে বের হয়েছিল।
সাঈদ আহমদ জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিনি ৫৫ জনকে আসামী করে মামলা করেছিলেন। তার প্রত্যাশা দ্রুত তদন্ত শেষ করে যাতে ন্যায় বিচার পান। তদন্তে যাতে কোন নিরাপরাধ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্থ কিংবা কোন অপরাধী ছাড় না পায়।
এদিকে, আন্দোলনে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে সানির পরিবার। সুষ্ঠু বিচারের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা এখনও আইনের আওতায় না আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন পরিবারের সদস্যরা।
সিলেটের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক জানান, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলাগুলোতে আসামী অনেক। সতর্কতার সাথে তথ্য-প্রমাণ যাচাই বাছাই করতে হচ্ছে। এজন্য একটু সময় লাগছে। তবে জেলা পুলিশের হাতে থাকা মামলাগুলোর তদন্তের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু আসামী গ্রেফতার হয়েছে। শিগগিরই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ




