ছবি: সিলেট ভিউ গ্রাফিক্স।

সারা দেশের সাথে সাথে জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ছিল পুরো সিলেট। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মহানগরীর বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়িতে হামলা-লুটপাটের ঘটনায় পুলিশের ১০১টি আগ্নেয়াস্ত্র খোয়া যায়। এর মধ্যে ৮৫টি উদ্ধার হলেও এখনও হদিস মেলেনি ১৬টি অস্ত্রের। পাশাপাশি লুণ্ঠিত অস্ত্রের পাঁচ হাজারের বেশি গুলিও এখনও নিখোঁজ। আন্দোলনের সময় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করা অস্ত্রধারীদেরও অনেকের সন্ধান মেলেনি। ফলে উদ্ধার না হওয়া অস্ত্র ও গুলি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ বিরাজ করছে।

 


দেখা গেছে, জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সিলেটে পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদেরও অস্ত্র হাতে মাঠে নামতে দেখা যায়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই নগরীর আখালিয়া এলাকায় পুলিশের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় অংশ নেন ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। ৪ আগস্ট নগরীর কোর্ট পয়েন্টে পূর্বনির্ধারিত ছাত্র-জনতার সমাবেশস্থলে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চড়াও হন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা।

 

সূত্র জানায়, ওই দিন অন্তত ৩০ জন ক্যাডার কোর্ট পয়েন্টে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও গুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। পরে জিন্দাবাজার, আম্বরখানা ও নয়া সড়কসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায়ও অস্ত্র উঁচিয়ে ত্রাসের সৃষ্টি করা হয়।

 

ওই দিন অস্ত্র হাতে যাদের দেখা যায়, তাদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী যুবলীগ নেতা রুহুল আমিন শিবলু, মহানগর যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম এ হান্নান, ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আফতাব হোসেন খান, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অনীক, ছাত্রলীগ নেতা আনসার আহমদ ওরফে শুটার আনসার, জায়েদ আহমদ, যুবলীগ নেতা মুনিম আহমদ ও বাবুল আহমদ পাঙ্গাশ। তৎকালীন মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রুহুল আমিন শিবলুর হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি অত্যাধুনিক এম-১৬ রাইফেল বলেও বিভিন্ন মহলে দাবি করা হয়।

 

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অস্ত্রধারীদের অধিকাংশই আত্মগোপনে চলে যান। তাদের অনেকে ভারতে পালিয়ে যান। পরে কেউ কেউ ভারত থেকে অন্য দেশেও পাড়ি জমান। রুহুল আমিন শিবলু, এম এ হান্নান ও আফতাব হোসেন খান বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। কয়েকজন এখনও ভারতে অবস্থান করছেন বলেও সূত্র জানিয়েছে।

 

অন্যদিকে, ৫ আগস্ট সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়িতে হামলা-লুটপাটের সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। এসএমপি সূত্রে জানা গেছে, ওই দিন বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে মোট ১০১টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে ৮৫টি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখনও উদ্ধার হয়নি ১৬টি আগ্নেয়াস্ত্র। এছাড়া পাঁচ হাজারের বেশি গুলিও এখনও লুকায়িত রয়েছে।

 

সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সিলেটভিউকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, নথি ও বিভিন্ন আলামত পুড়ে যায়। হামলাকারীরা থানা ও ফাঁড়ি থেকে পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, বারুদ, সাউন্ড গ্রেনেড, ম্যাগাজিন, কার্তুজ, টিয়ারশেল ও টিয়ারগ্যাস গ্রেনেডসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে যায়। সব অস্ত্র এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।’

 

তিনি বলেন, ‘লুণ্ঠিত অস্ত্র ও আন্দোলনের সময় প্রদর্শিত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কোনো ব্যক্তি এসব অস্ত্রের সন্ধান পেলে নির্ভয়ে পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রেখেই অভিযান পরিচালনা করে অস্ত্র উদ্ধার করা হবে।’

 

সিলেট জেলা পুলিশের আওতাধীন বিভিন্ন থানা থেকেও ৫ আগস্ট ৩১টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে ২১টি উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট জেলা পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক। তিনি জানান, অস্ত্র উদ্ধারে গোয়েন্দা তৎপরতাও চলমান রয়েছে।

 

এদিকে র‌্যাব সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের পর সিলেট বিভাগ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫১টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১১৪ রাউন্ড গুলি, ছয়টি ম্যাগাজিন, ৩৭ হাজার ৭০ গ্রাম বিস্ফোরক, ২৩৫টি ডেটোনেটর, চারটি সাউন্ড গ্রেনেড, পাঁচটি পেট্রোল বোমা, ১১টি ককটেল এবং বিপুল পরিমাণ এয়ারগানের গুলিসহ ১৫৫টি এয়ারগান উদ্ধার করেছে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৯)।

 

র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৯) এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ সিলেটভিউকে বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে একটি বিদেশি তুরাশ পিস্তল, একটি অ্যান্টি-রায়ট গ্যাসগান, একটি সাউন্ড গ্রেনেড, সাত রাউন্ড গুলি, একটি ম্যাগাজিন, তিন রাউন্ড শর্টগানের কার্তুজ, দুটি টিয়ারশেল ও তিনটি টিয়ারগ্যাস গ্রেনেড রয়েছে। আগস্ট-পরবর্তী সময়ে পুলিশের কাছ থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্য থেকেও এসব অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।’

 

তিনি বলেন, ‘অবৈধ ও পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে পুলিশের লুণ্ঠিত বেশ কয়েকটি অস্ত্র, গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও টিয়ারশেল গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়েছে।’

 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘পুলিশের কাছ থেকে লুণ্ঠিত ১৬টি আগ্নেয়াস্ত্র ও পাঁচ হাজারের বেশি গুলি এখনো উদ্ধার না হওয়ায় এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ কোথায় রয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ ও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনকারীদের অনেকের অবস্থানও এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।’

 

তিনি বলেন, ‘লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ দ্রুত উদ্ধার করা না গেলে এগুলো জননিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এসব অস্ত্র ভবিষ্যতে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। তাই জননিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনের উচিত দ্রুত লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’

 

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া ০৯