ছবি: সিলেট ভিউ গ্রাফিক্স ও এআই।
চোখে ইউরোপের রঙিণ স্বপ্ন। বৈধপথে ইউরোপ যাত্রার সুযোগও সীমিত। তাই মুঠোয় প্রাণ নিয়ে সিলেটের তরুণরা বেছে নিচ্ছেন ঝুঁকিপূণ অবৈধ পথ। ‘হয় ইউরোপ, না হয় মৃত্যু’- এই পণ নিয়েই তারা যেন শুরু করেন স্বপ্নের ইউরোপযাত্রা। সেই যাত্রা কখনো গন্তব্যে পৌঁছায়, আবার কখনো দালালের খপ্পরে পড়ে সাগরে ঘটে সলিল সমাধি। এরপরও থেমে নেই এই ঝুঁকিযাত্রা। গেল এক বছরে দালালদের হাত ধরে অবৈধ পথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে অন্তত অর্ধশত তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন। দালাল চক্রে আত্মীয়-স্বজন থাকায় দুর্ঘটনার পরও অনেকে মুখ খুলতে চান না। এছাড়া ওয়ার্কপারমিট ভিসায় যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে শত শত তরুণ হচ্ছেন সর্বস্বান্ত। কোটি কোটি টাকা নিয়ে গা ঢাকা দিচ্ছে কনসালটেন্সি নামক ‘আদমপাচারকারী প্রতিষ্ঠান’।
পুলিশ বলছে, দালালচক্রকে সনাক্ত ও জড়িতদের গ্রেফতারে তাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু প্রতারক গ্রেফতারও হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপযাত্রার নামে সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি ঘটে চলতি আগস্ট মাসে। ৩ আগস্ট দালালদের হাত ধরে লিবিয়া থেকে নৌকায় করে গ্রিসের পথে রওয়ানা হন বেশ কিছু অভিবাসী। নৌকাটি দিকভ্রান্ত হলে খাবার ও পানীয় সংকটে মারা যান সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের ৭ জনসহ ৯ বাংলাদেশি। নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছালে সেখানে উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ২৪ জন ছিলেন সিলেট বিভাগের। ওই ঘটনায় নিখোঁজ হন জগন্নাথপুর উপজেলার ৮ তরুণ।
স্বজনদের দেওয়া তথ্য মতে, ওই দালালচক্রে ছিলেন জগন্নাথপুরের ইছাগাঁওর আজিজ, চিলাউড়ার আবদুল করিম, বাগময়না গ্রামের জুয়েল আহমদ টিপু ও দোয়ারাবাজারের জসিম। ৯ মে লিবিয়ার জুয়ারা শহর থেকে নৌকায় করে ৭৫ অভিবাসী রওয়ানা হন ইতালির উদ্দেশ্যে। তিউনিসিয়ার উপকূলে তাদেরকে ছোট একটি নৌকায় তোলার সময় সেটি ডুবে যায়। এতে মারা যাওয়া অর্ধশতাধিক ব্যক্তির মধ্যে সিলেট অঞ্চলের অন্তত ২০ জন ছিলেন। এদিকে, সিলেট সদর উপজেলার পাগইল গ্রামের শাহীন আহমদ দালালের মাধ্যমে ইরাকে থেকে তুরস্ক ও গ্রিস হয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন। ২৩ আগস্ট ভ্যানে চড়ে ইতালির যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় নিহত হন শাহীন।
ইউরোপ যাওয়ার জন্য রওয়ানা হয়ে নিখোঁজ রয়েছেন সিলেটের আরও ৮ তরুণ। নিখোঁজরা হলেন- কানাইঘাট উপজেলার দাওয়াদিরি গ্রামের জাকারিয়া আহমদ, জকিগঞ্জের গড়রগ্রামের তোফায়েল আহমদ, বিয়ানীবাজারের উত্তর গাঙপাড়ের আলতাফ হোসেন, খশির চাতল গ্রামের সুলতান মাহমুদ পলাশ, আব্দুল্লাপুরের জুবেল আহমদ, খশির গ্রামের আবু তাহের, খশির নয়াবাড়ীর ওবায়দুল হক ও পশ্চিম ঘুঙ্গাদিয়া গ্রামের আবু সুফিয়ান।
নিখোঁজ আলতাফ হোসেনের বাবা আব্দুল লতিফ জানান, গেল বছর জুলাইয়ে বিয়ানীবাজারের ঘুঙ্গাদিয়া নয়াগাঁওয়ের দালাল মুতির মাধ্যমে তার ছেলে লিবিয়ায় যায়। সেখানে দুই মাস জিম্মি রেখে সাড়ে লাখ টাকা আদায় করে গত ২২ ডিসেম্বর সিলেটের আরো কয়েকজন তরুণের সাথে আলতাফ সাগরপথে ইতালির উদ্দেশ্যে নৌকায় ওঠে। এরপর থেকে সে নিখোঁজ।
নিখোঁজ পলাশের বাবা মিছবাউল হক জানান, ‘দালাল বলেছে আমার ছেলে আফ্রিকার কোন এক দেশের জেলে রয়েছে। তার কথায় বিশ্বাস রেখে আমরা দিন গুণছি।’
এদিকে, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ওয়ার্কপারমিটে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কনসালটেন্সি ফার্ম নামক ‘আদমপাচার চক্র’। হেলথ কেয়ার ভিসায় যুক্তরাজ্যে পাঠানোর নামে গোলাপগঞ্জের তিন জনের কাছ থেকে ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় গত ১৬ আগস্ট কয়েস আহমদ নামের এক প্রতারককে গ্রেফতার করেছে র্যাব।
স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় যুক্তরাজ্যে পাঠানোর নামে ১ কোটি ২ লাখ ২৩ হাজার ৩০৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বদরুজ্জামান তানভীর নামের এক ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। ২৯ মে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর নামে শতাধিক তরুণের কাছ থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকা আত্মসাত করে ‘অ্যামেক্স অ্যাসোসিয়েটস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান পালিয়েছে।
ইউরোপে পাঠানোর নামে চারজনের কাছ থেকে ৭৮ লাখ টাকা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ ওঠেছে ট্রাভেল জোন নামের একটি কনসালটেন্সি ফার্মের বিরুদ্ধে। চৌধুরী মুশফিক মুনিম নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক নুরুল মুজতবা চৌধুরী এই টাকা আত্মসাত করেছেন। এ ঘটনায় তিনি মামলা করেছেন।
আটাব সিলেটের সাবেক সভাপতি আবদুল জব্বার জলিল জানান, সিলেটের কিছু লোক ঝুঁকি জেনেই তাদের সন্তানদের অবৈধপথে বিদেশ পাঠানোর পথ বেছে নিচ্ছেন। অথচ যে টাকা দিয়ে তারা বিদেশ পাঠান সেটা দিয়ে দেশে তাদের সন্তানদের উজ্জ্বল জীবন গড়ে দিতে পারতেন। এই প্রবণতা থেকে বের হতে না পারলে দালালচক্র সুবিধা নিবেই। এছাড়া, সিলেটে কনসালটেন্সি ফার্মের নামে কতিপয় অবৈধ ব্যবসায়ী বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর নামে মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের যতটুকু নজরদারি রাখা উচিত ছিল সেটা তারা করছেন না।
মানবপাচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সুমন কুমার জানান, চলতি বছরের ৮ মাসে মানবপাচারের ঘটনায় সুনামগঞ্জ জেলায় ১৬টি মামলা হয়েছে। দালালদের বেশিরভাগই ভূক্তভোগীদের আত্মীয়-স্বজন হওয়ায় তারা তথ্য দিতে চায় না। প্রতারিত হওয়ার পরও তারা মামলা করতে চায় না। এরপর বুঝিয়ে সুঝিয়ে মামলা করাতে হয়। দালালরা বিভিন্ন দেশে অবস্থান করায় তাদেরকে গ্রেফতারও করা যায় না। মামলাগুলোর তদন্ত পুলিশ ও সিআইডি করছে। দালালদের গ্রেফতার ও এই নেটওয়ার্কের সাথে দেশের কারা জড়িত আছে সেটি সনাক্তে পুলিশ কাজ করছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম বলেন, ‘বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। স¤প্রতি যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে পাঠানোর নামে ভুয়া ভিসা ও বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রতারণার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে অবৈধ এজেন্সি ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
সিলেটের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক জানান, অবৈধপথে ইউরোপ বা অন্য কোন দেশে যাওয়ার জন্য কেউ দালালদের সাথে চুক্তি করে তখন সেটা গোপন রাখে। বৈধ ট্রাভেলস এজেন্সির মাধ্যমেও তারা বিদেশ যাওয়ার চুক্তি করে না। অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করে তাই লেনদেনের সময় কাউকে বলে না। প্রতারিত হওয়ার পর পুলিশের শরণাপন্ন হয়। তখন দালালরা হাওয়া হয়ে যায়। এরপরও এই দালালচক্রকে সনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে।
এ ব্যাপারে জানতে সিলেটের ডিআইজি ড. মো: জিল্লুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে, দেশে ও বিদেশে থাকা দালাল চক্রের তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। লিবিয়া থেকে ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে সুনামগঞ্জের ১২ তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা গুরুত্বসহকারে তদন্তের নির্দেশ দিয়ে মঙ্গলবার প্রশাসনের এক সভায় মন্ত্রী বলেছেন, অবৈধভাবে সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা রোধে জড়িতদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। অবৈধপন্থায় বিদেশ যাওয়া বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ শাদিআচৌ/ এহিয়া-০৪




