ছবি: সিলেট ভিউ।
সিলেটের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার একটি বড় অংশ পূরণ হতে যাচ্ছে। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নির্মিত ১০০ শয্যার বিশেষায়িত ক্যান্সার ও কিডনি ইউনিট আগামী ছয় মাসের মধ্যে চালু হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনকালে তিনি এ কথা জানান।
জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ শেষের পথে থাকা এই বিশেষায়িত হাসপাতাল চালু নিয়ে এতদিন ছিল অনিশ্চয়তা। ভবনের প্রায় পুরো কাজ শেষ হলেও জনবল অনুমোদন, যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে চিকিৎসাসেবা শুরু করা যায়নি। ফলে ক্যান্সার ও কিডনি রোগীদের জন্য নির্মিত আধুনিক এই চিকিৎসাকেন্দ্রটি কার্যত পড়ে রয়েছে চালুর অপেক্ষায়।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনকালে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘সিলেটে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে বর্তমানে তিনটি প্রধান প্রকল্প নিয়ে পুরোদমে কাজ চলছে। ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের বাকি কাজ দ্রুত শেষ করতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।’
সূত্র জানায়, ‘আটটি বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালের অক্টোবরে সিলেটের এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ১৭ তলা ভিত্তির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে ১৫ তলা ভবন। সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির মূল বাজেট ধরা হয়েছিল ৮৯ কোটি ৫৬ লাখ ৯৮ হাজার ৪০৬ টাকা। ২০২১ সালের ১৮ আগস্ট প্রকল্পের জন্য চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২৪ মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে ভবনের ভৌত কাঠামো ও ফিনিশিংয়ের প্রায় ৯৮ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। দুটি বেজমেন্টসহ ভবনের সিভিল, স্যানিটারি ও অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক কাজও সম্পন্ন হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশেষায়িত এই ইউনিটে জটিল ক্যান্সার রোগীদের জন্য রেডিওথেরাপি, ব্র্যাকিথেরাপি ও ডে-কেয়ার কেমোথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে। পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক আধুনিক ওয়ার্ডের পাশাপাশি থাকবে সার্জিক্যাল ব্লক ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। কিডনি রোগীদের জন্য নেফ্রোলজি ইউনিট ও আধুনিক ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং হৃদরোগীদের জন্য ডে-কেয়ার কার্ডিয়াক সেন্টারের সুবিধাও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এত বড় অবকাঠামো তৈরি হলেও এতদিন চিকিৎসাসেবা চালু না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা, জনবল কাঠামোর অনুমোদন না হওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণে প্রকল্পটি থমকে ছিল। হাসপাতাল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে ক্যান্সার চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর ও ব্র্যাকিথেরাপি মেশিন এবং ডায়ালাইসিসের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার প্রক্রিয়াও প্রশাসনিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন জটিলতায় আটকে রয়েছে।
এদিকে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক ক্যান্সার ও কিডনি রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে শয্যার সংকটের কারণে অনেক রোগীকে চিকিৎসা নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের আর্থিক সামর্থ্য কম, তারা প্রয়োজনীয় রেডিওথেরাপি ও ডায়ালাইসিস সেবা পেতে বড় ধরনের সমস্যায় পড়ছেন। অন্যদিকে সামর্থ্যবান রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা কিংবা দেশের বাইরে যেতে হচ্ছে।
নির্মাণকাজের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম জামাল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার মনসুর রহমান বলেন, ‘তাদের ভবন নির্মাণের কাজ শেষ। প্রায় এক বছর ধরে ভবন হস্তান্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। ভবনের আসবাব ও লিফট স্থাপনের কাজ প্রকল্প পরিচালক ও গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে হচ্ছে। ভবন বুঝিয়ে দিতে পারলেই তাদের কাজ শেষ হবে বলে জানান তিনি।’
প্রকল্প তদারকের দায়িত্বে থাকা সিলেট গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, ‘ভবন নির্মাণের প্রায় ৯৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। লিফট ও আনুষঙ্গিক কিছু কাজ বাকি রয়েছে। একাধিকবার লিফট কেনার দরপত্র আহ্বান করা হলেও ২০১৮ সালের নির্ধারিত দরে কোনো প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করতে রাজি হয়নি। এ কারণে নতুন করে দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সেটি কবে চূড়ান্ত হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ডলারের দর বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান তিনি।’
প্রকল্প পরিচালক ডা. তৌফিক হাসান ফিরোজ বলেন, ‘ডলারের দর বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদায় পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। প্রকল্পের মূল হিসাব তৈরির সময় ডলারের দাম ছিল প্রায় ১০৯ টাকা। পরে সরকারি রেট বেড়ে ১২৩ টাকা হওয়ায় সরঞ্জাম কেনার খরচও বেড়ে যায়। এ বিষয়ে নতুন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদিত হলে যন্ত্রপাতি কেনার প্রক্রিয়া শুরু হবে।’
তিনি বলেন, ‘সিলেটসহ দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে পৃথকভাবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সব প্রকল্পের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কাজ এগিয়ে নিতে হচ্ছে। তবে অবকাঠামোগত দিক থেকে সিলেটের ইউনিটটি অন্যগুলোর তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।’
জনবল প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘আটটি কেন্দ্রের জন্য চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য কর্মীর প্রায় ১৮ হাজার পদ সৃষ্টির একটি নতুন প্রস্তাব সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে আশা করছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালক হাসপাতালটি পুরোপুরি চালু করতে আরও সময় লাগতে পারে বলেও জানিয়েছেন। বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানির বিষয়টি জড়িত থাকায় পুরো কার্যক্রম শেষ করতে আরও সময় প্রয়োজন হতে পারে।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া-১১




