অন্ধকার নিঝুম ঘরে একা শুয়ে থাকা আর কপালে যেন ড্রিল মেশিন দিয়ে তীব্র ব্যথার অনুভূতি—মাইগ্রেনে আক্রান্ত কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি এক অতি পরিচিত নরকযন্ত্রণা। দৈনন্দিন কাজকর্ম, চাকরির স্থায়িত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অক্ষম করে দেওয়ার মতো এই শারীরিক অবস্থা মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিবিসি বাংলার একটি বিশেষ স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বিশ্বজুড়ে প্রতি সাতজনের মধ্যে অন্তত একজন মানুষ (প্রায় এক বিলিয়নেরও বেশি) মাইগ্রেনের সমস্যায় ভুগছেন। তবে এই যন্ত্রণাদায়ক রোগের প্রধান শিকার নারীরা; পুরুষদের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেশি। এটি কেবল সাধারণ কোনো মাথাব্যথা নয়, বরং মস্তিষ্ককে পরিবর্তনের প্রতি অতি-সংবেদনশীল করে তোলা একটি সুনির্দিষ্ট জিনগত ও স্নায়ুবিষয়ক জটিলতা।
কেন পুরুষদের চেয়ে নারীরা মাইগ্রেনের ব্যথায় বেশি কষ্ট পান এবং কীভাবে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব—কালবেলার পাঠকের জন্য তা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
মাইগ্রেন কী এবং এর চার ধাপ
যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল মাইগ্রেন সেন্টার’-এর বিশেষজ্ঞ ডা. ক্যাটি মনরোর মতে, এটি একটি জিনগত ও স্নায়বিক অবস্থা। কিছু মানুষের মধ্যে মাইগ্রেনের জিন থাকলেও তা কখনো সক্রিয় নাও হতে পারে, তবে অন্যদের ক্ষেত্রে বাইরের নানা উদ্দীপক মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট পথ সক্রিয় করে নিউরোকেমিক্যাল নিঃসৃত করে।
মাইগ্রেনের সাধারণ উপসর্গ মাথাব্যথা হলেও এর সাথে বমি বমি ভাব, বমি, মাথা ঘোরা এবং ব্রেন ফগ (মনোযোগহীনতা) হতে পারে। এটি সাধারণত চারটি ধাপে ঘটে:
প্রোড্রোমাল বা পূর্বাভাস ধাপ: আক্রমণ শুরুর আগে ঘাড়ে ব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঘন ঘন হাই তোলার মতো সংকেত দেখা দেয়।
অরা ধাপ: প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোগীর ক্ষেত্রে মাথাব্যথা শুরুর আগে চোখের সামনে জিগজ্যাগ রেখা বা সাদা দাগের মতো দৃষ্টিভ্রম ঘটে।
আক্রমণ পর্যায়: তীব্র মাথাব্যথার এই প্রধান ধাপটি ৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
পোস্ট-ড্রোমাল বা ‘হ্যাংওভার’ ধাপ: ব্যথা কমে যাওয়ার পর এক থেকে দুই দিন পুরো শরীরে তীব্র ক্লান্তি থাকে, যা যেন শরীরের ওপর দিয়ে ‘স্টিমরোলার’ চলে যাওয়ার মতো অনুভূতির সৃষ্টি করে।
নারীদের বেশি আক্রান্ত হওয়ার মূল কারণ: হরমোনের খেলা
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে প্রকাশিত চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, শৈশবে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে মাইগ্রেনের হার সমান (প্রায় ১০ শতাংশ) থাকে। কিন্তু বয়ঃসন্ধিতে মেয়েদের মাসিক চক্র শুরু হওয়ার পর থেকেই এই চিত্রে বড় পরিবর্তন ঘটে এবং নারীরা সংখ্যায় অনেক এগিয়ে যান।
ইস্ট্রোজেনের পতন: মাসিক শুরুর ঠিক আগে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়া মাইগ্রেনের আক্রমণকে ত্বরান্বিত ও ব্যথাদায়ক করে তোলে।
পেরিমেনোপজ ও মেনোপজ: মেনোপজ বা মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগের রূপান্তর পর্যায়ে (পেরিমেনোপজ) হরমোনের চরম ওঠানামা ঘটে। তবে মেনোপজের পর হরমোনের মাত্রা স্থিতিশীল হয়ে এলে আক্রমণের তীব্রতা ও সংখ্যা অনেকটাই কমে আসে।
পরিবারের বাড়তি চাপ ও লাইফস্টাইল ট্রিগার
হরমোনের পাশাপাশি নারীদের সামাজিক ভূমিকা ও মানসিক চাপও একটি বড় ভূমিকা রাখে।
বহুমুখী দায়িত্ব: একাধারে সংসার চালানো, সন্তান লালন-পালন এবং বয়োবৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখভাল করার বহুমুখী দায়িত্ব নারীদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
চাপের পর হঠাৎ শিথিলতা: দীর্ঘ সময় মানসিক চাপে থাকার পর হঠাৎ শান্ত সময় বা বিশ্রামের পরিবেশ তৈরি হলেও মাইগ্রেনের আক্রমণ শুরু হতে পারে।
লাইফস্টাইলের তারতম্য: রক্তে শর্করার অনিয়ম, কম বা বেশি ঘুম, পানিশূন্যতা এবং আবহাওয়া ও বায়ুচাপের পরিবর্তন মাইগ্রেনের উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। এমনকি ছুটির দিনে একটু দেরিতে ঘুমানো বা রুটিন বদলে যাওয়াও ব্যথার কারণ হতে পারে।
অন্যান্য সহযোগী স্বাস্থ্য সমস্যা
শরীরে আয়রনের স্বল্পতা, থাইরয়েডের কার্যকারিতা কমে যাওয়া এবং সিলিয়াক ডিজিজ (একটি অটোইমিউন রোগ যা গ্লুটেনের প্রতি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ক্ষুদ্রান্ত্রের ক্ষতি করে)—এসব স্বাস্থ্যগত জটিলতাও মাইগ্রেনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিরোধ ও প্রতিকারে করণীয়
মাইগ্রেন পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক জীবনযাপন ও দ্রুত চিকিৎসায় এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব:
শুরুতেই ওষুধ গ্রহণ: ব্যথা খুব খারাপ আকার ধারণ করার আগেই তুষারগোলা-এর মতো প্রভাব থামিয়ে দিতে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খাওয়া জরুরি। বমি প্রতিরোধক ট্যাবলেট এবং আইবুপ্রোফেন বা অ্যাসপিরিনের মতো ব্যথানাশক সাহায্য করতে পারে। তবে সাধারণ প্যারাসিটামল এতে কম কার্যকর এবং কোডিনজাতীয় ওষুধ মাথাব্যথা বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া বিশেষ ট্রিপটানস বা সিজিআরপি ব্লকার ওষুধও বেশ কার্যকর।
নিয়মিত জীবনযাপন: অনিয়মিত ডায়েট এড়িয়ে চলা, রক্তে শর্করা স্বাভাবিক রাখা এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও জেগে ওঠার অভ্যাস করা উচিত।
‘মাইগ্রেন গোয়েন্দা’ হওয়া: আক্রমণ শুরুর দুই-তিন দিন আগে কোন কোন অভ্যাসে পরিবর্তন এসেছিল তা চিহ্নিত করে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা।
সাপ্লিমেন্ট ও অন্যান্য পদ্ধতি: চিকিৎসকের পরামর্শে ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি২ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ ব্যথার সংখ্যা কমাতে পারে। এ ছাড়া আকুপাংচার, যোগব্যায়াম, তাই চি এবং প্রপার পেন থেরাপিও ইতিবাচক ফল দেয়।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-১২




