ওসমানীনগর উপজেলার মোবারকপুর উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে অভ্যন্তরীণ আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কমিটির পদ-পদবি ও কর্তৃত্ববাদ নিয়ে মতবিরোধ, মনগড়া বিদ্যালয় পরিচালনাসহ নানা বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে সমালোচনার সৃষ্টি হওয়ায় তোলপাড় হচ্ছে। প্রকৃত দাতা সদস্যদের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে মনোনীত ব্যক্তিদের আজীবন দাতা সদস্য নির্বাচন করাসহ বিস্তর অভিযোগ বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।
বিদ্যালয়ের ৬০ লক্ষ টাকার হিসাব চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিকট লিখিত অভিযোগ ও আবেদন প্রেরণের পর ৩০ সেপ্টেম্বর তিন সদস্যসের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি গঠনের পর তদন্ত ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে ৮অক্টোবর আরও একটি পাল্টা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের আর্থিক বিষয় নিয়ে পাল্টা-পাল্টি অভিযোগ দেওয়ায় আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় ও প্রবাসীদের উদ্যোগে ২০২০সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন আব্দুল খালিক ও প্রধান শিক্ষক করা হয় একই গ্রামের আবুল লেইসকে। ২০২১সালে আব্দুল খালিক যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। বিদায়কালে তাকে বিদ্যালয়ে পক্ষ থেকে সংবর্ধিত করা হয়।
বিধি মোতাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নির্বাচিত হন ইউপি সদস্য শামছুল ইসলাম শামীম। ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রধান শিক্ষক আবুল লেইস ছুটি নিয়ে কানাডা চলে যান। যাওয়ার আগে আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রদান করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয় একই এলাকার বশির মিয়াকে। দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে না জানিয়ে অনৈতিক ভাবে হারুন মিয়াকে সভাপতি করেন। বশির মিয়া বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভা করে প্রধান শিক্ষক আবুল লেইসের দেওয়া আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করেন। ক্ষমতা পাওয়ায় বশির মিয়া নিজের ইচ্ছেমত বিদ্যালয় পরিচালা করেন। এতে বিভিন্ন অনিয়ম দেখা দিলে স্থানীয়দের তোপের মুখে নিজের মনোনিত একজন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করেন তিনি। ছুটি নিয়ে প্রবাসে যাওয়া প্রধান শিক্ষক আবুল লেইস পুনরায় বিদ্যালয়ে আসলে দেখতে পান তার স্থলে আরও একজন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি হতাশ হয়ে ফের প্রবাসে চলে যান। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছানা উল্লা দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থানীয়দের নানা প্রশ্নে জর্জরিত হন বশির মিয়ার বিভিন্ন অনিয়ম সামনে আসলে তা আড়াল করতে আবারও বিগত সময়ের হিসেব চাওয়া হলে বিদ্যালয়ে সভার আয়োজন করা হয়। সেই সভায় পুনরায় বিদ্যালয়ের হিসাব প্রদান করেন সাবেক সভাপতি শামছুল ইসলাম শামীম।
অভিযোগ রয়েছে, নিজ এলাকায় বিদ্যালয় হওয়ায় বশির মিয়ার নানা অনিয়ম ঠেকাতে ব্যর্থ হন প্রধান শিক্ষক ছানা উল্যা। নিরুপায় হয়ে চলতি বছরের শুরুতে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়ে দেন তিনি। প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হন রণধীর মোহন দেব। অভিযোগ রয়েছে, বশির মিয়ার ফাঁদে পা দেন রণধীর মোহন। বিদ্যালয় পচিালনার অর্থ যুক্তরাজ্য থেকে যোগান দেওয়া হলেও নানা অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ হন প্রবাসীরা। মোবারকপুর উচ্চ বিদ্যালয় বাস্থবায়ন কমিটি ইউকের সদস্যরা এসব বিষয় নিয়ে একাধিকবার যুক্তরাজ্যে সভা করেন। তৎকালীন কমিটির সভাপতি ফজল উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন রশিদ খুকন নানা দিক নির্দেশনা দেন। কিন্তু বিদ্যালয়ে সুষ্টু ব্যবস্থাপনার পরিবেশ ফিরে আসেনি। বশির মিয়ার ইন্ধনে যুক্তরাজ্যে বাস্তবায়ন কমিটি ভাঙন ধরে এবং অন্যান্যদের নিয়ে আরেকটি মনগড়া কমিটি গঠন করা হয়। ক্লাস বন্ধ রেখে সভা আহবান করে যুক্তরাজ্যে গঠিত বিতর্কিত মোবারকপুর উচ্চ বিদ্যালয় উন্নয়ন কমিটি প্রকাশ করা হয়। কমিটির তালিকা প্রকাশের পর অনাস্থা প্রকাশ করে ৩০-৪০ জন অভিভাবক, ভূমিদাতা ও দাতা সদস্য সভাস্থল ত্যাগ করেন।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠাকালীন মোবারকপুর উচ্চ বিদ্যালয় বাস্তবায়ন ও পরিচালনা কমিটি ইউকে পুনর্গঠন করে ফজল উদ্দিনকে সভাপতি, শিপন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক ও নুরুজ্জামানকে কোষাধ্যক্ষ করে পুর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়। এছাড়া, ১৩ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয় পরিচালনায় জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, অ্যাডহক কমিটিকে না জানিয়ে অর্থ আত্মাসাৎ করতে নীতিমালা লঙন করে বিদ্যালয়ে নতুন ২০জন দাতা সদস্য মনোনিত করা হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর অ্যাডহক কমিটিকে না জানিয়ে নতুন ২০জন আজীবন দাতা সদস্যদের তালিকা বিদ্যালয়ে টানানো হয়। যুক্তরাজ্যস্থ উন্নয়ন কমিটিকে খুশি করতে ওই কমিটির সভাপতি আব্দুল মন্নান ও তার স্ত্রী, সদস্য মাসুক আলী ও তার পিতা, আব্দুস সালাম এবং তার স্ত্রীকে আজীবন দাতা সদস্য মনোনিত করা হয়। কিন্তু বৈধভাবে আজীবন দাতা সদস্য মনোনিত হওয়া আমিনুল হক রিপন, আব্দুল করিম, সাবেক প্রধান শিক্ষক আবুল লেইসকে আজীব দাতা সদস্য তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, বিধি মোতাবেক ২০ জন আজীবন দাতা সদস্য মনোনিত করার অর্থ বিদ্যালয় তহবিলে জমা হয়েছে কী না তা প্রকাশ করতে ২৮সেপ্টেম্বর এলাকাবাসীর পক্ষে ঊর্ধ্বতনদের নিকট পৃথক আবেদন ও অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগ পেয়ে তাৎক্ষণিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রণধীর মোহন দেবকে শোকজ করা হলে ১১ অক্টোবর তিনি লিখিতভাবে শোকজের জবাব ও ব্যাখ্যা প্রদান করেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে ৩০ সেপ্টেম্বর সিকন্দরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রিপন সূত্রধর, কেএ জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মামুনুর রশিদ ও নবগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামানকে নিয়ে ৩সদস্যের তদন্ত কমটি গঠন করেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তদন্তকালে আজীবন দাতা সদস্যদের তালিকা মুছে শুধু দাতা সদস্যদের তালিকা টানানো হয়। এমনকী তদন্ত কমিটি গঠনের পর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আড়ালের ফন্দি করা হয়। তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত করতে চলচাতুরির আশ্রয় নেওয়া হয়। দুইবার হিসাব প্রদান করাপরও সেই হিসাব আবারও চেয়ে ৮ অক্টোবর ঊর্ধ্বতনদের কাছে পাল্টা অভিযোগ দেয়া হয়।
এলাকার সচেতন শিক্ষানুরাগীরা জানিয়েছেন, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় ফজল উদ্দিন বিদ্যালয় বাস্তবায়ন ও পরিচালনা কমিটি ইউকের সভাপতি ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল খালিকের পরিবারের পক্ষ থেকে বিদ্যালয়ে ২৬ শতক, তার ভাই আলাউদ্দিনের পরিবারের পক্ষ থেকে ১৫ শতক ভূমি এবং বিদ্যালয়ের তিনটি ভবন প্রতিষ্ঠায় ব্যয় বহনসহ আর্থিক সহায়তা দিলেও তাদের বিরুদ্ধে সাজানো অভিযোগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করা হচ্ছে।
এছাড়া, অ্যাডহক কমিটি থাকার পরও প্রবাসীদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে বাণিজ্য করতে বিদ্যালয় উন্নয়ন কমিটির নামে আরেকটি কমিটি গঠনের পর থেকে বিদ্যালয়ে আরও চরম অব্যবস্থাপনা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় শেল্টার নিতে মানিক মিয়াকে ওই কমিটির সভাপতি নির্বাচিত করা হয় বলে অভিযোগ ওঠেছে।
বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি ইউপি সদস্য শামছুল ইসলাম শামীম বলেন, আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে ৪১শতক ভূমি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় দান করি। আমাদের আত্মীয় স্বজনরা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ২বছর সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করেন। নির্বাচনে পরাজিত হয়ে মানিক মিয়াসহ একটি কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। বিদ্যালয় দখল করে সকল কাগজপত্র গায়েব করে বর্তমানে আজীবন দাতা সদস্য সংগ্রহ করে ৬০ লক্ষ টাকা তারা আত্মসাৎ করেছেন। আমিসহ এলকাবাসী ওই অর্থের হিসাব চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সেই তদন্ত ভিন্ন দিকে নিতে এবং অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি জানাজানি না হওয়ার জন্য তারা পাল্টা সাজানো অভিযোগ দিয়ে আমার ও আমার পরিবারের সদস্যসহ এলাকার সম্মানিত ব্যক্তিদের মানহানির চেষ্টা করা হচ্ছে। এবিষয়ে আমরা আইনি প্রতিকার চাইবো।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রণধীর মোহন দেব বলেন, কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে আজীবন দাতা সদস্য নির্বাচিত করা হবে। আজীবন দাতা সদস্যের তালিকা সরিয়ে শুধুমাত্র দাতা সদস্যের তালিকা টানানোর বিষয়ে তিনি বলেন, কে বা কারা এটা করেছে তা আমার জানা নেই।
অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা কেএ জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মামুনুর রশিদ বলেন, আমরা ১০ অক্টোবর সরজমিন বিদ্যালয়ে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছি। লিখিতভাবে তা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করা হবে। তবে, বিদ্যালয়ে শুধু মাত্র দাতা সদস্যদের তালিকা পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বদিউজ্জামান আহমদ বলেন, তদন্ত কমিটি বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। শীগগির প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি বলেন, ৮ অক্টোবর পাল্টা অভিযোগ দেওয়ার বিষটি তার জানা নেই।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/রনিক/এসডি-১৯





