আজকাল যে কেউ যে কাউকে অবলিলায় মানবতার ফেরিওয়ালা/সমাজসেবক/জনদরদী ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করেন। কেননা, ফেসবুকে লিখতে কিংবা মুখে বলতে কোনো জবাবদিহিতা করতে হয় না বা কোনো টাকা খরচ হয় না। একটি সময় ছিল যখন সমাজসেবা অধিদপ্তরের সনদ ছাড়া কাউকে সমাজসেবক বলা যেতো না। তখন কয়েক গ্রাম খুঁজেও একজন সমাজসেবক পাওয়া যেতো না। এখন কয়েক জনের মধ্যে কিছু টাকা বিতরণ করে ফেসবুকের কল্যাণে নিজেকে সমাজসেবক হিসেবে জাহির করা হয়। এই প্রচারসেবকদের অন্তরালে শত নয় হাজারো মানুষ নিরবে নিভৃতে সমাজের সুবিধা বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রচারবিমূখ এই মানবেরা মানবসেবাটাকে বড় করে দেখেন। এরাই মানবতার প্রকৃত ফেরিওয়ালা।
সেই মানবিক মানুষদের একজন মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের কালিনগর গ্রামের বাসিন্দা সালমান কবির (৪২)। পেশায় তিনি দোকান, অফিস, বা বাসা-বাড়ির ডেকোরেশন কারিগর। কর্মের পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ অসহায় মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। আর্থিক ও শারীরিক ভাবে অস্বচ্ছল অসুস্থ মানুষদের জুড়ী. সিলেট কিংবা ঢাকায় ডাক্তারের নিকট নিয়ে যাওয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো, অপারেশন করানো, ওষুধক্রয়সহ চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা নিজ দায়িত্বে করে দেন। ক্ষেত্র বিশেষ যাতায়াত খরচ, প্রয়োজনীয় ওষুধ এমন কি খাবারটাও পর্যন্ত কিনে দেন। এ জন্য নিজের উপার্জিত টাকা থেকে ব্যয় করা ছাড়াও নিজের আত্মীয়-স্বজন, প্রবাসীসহ বিভিন্ন দানশীলদের নিকট হাত পেতে ব্যয় নির্বাহ করেন। অনেকের আর্থিক সামর্থ্য আছে কিন্তু চিকিৎসার সঠিক পথ জানা না থাকা বা নিয়ে যাবার মত কোনো লোক নেই এমন মানুষদের নিয়েও ছুটেন হাসপাতাল পানে। তবে বিনিময়ে কোনো কিছু না নিয়ে অনেক সময় খাবারটাও নিজের পকেটের টাকায় কিনে খান। এছাড়া রোগীর শারীরিক সেবা শুশ্রষা করা, অসুস্থ বা মৃত্যু পথযাত্রীদের পাশে বিনিদ্র রাত কাটাতেও ভুলেন না। জাতী-ধর্ম, নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে সবার সেবায় তিনি সদা প্রস্তুত। শোনা মাত্র চলে যান রোগীর কাছে। রক্ত সংগ্রহ করে দিতেও এগিয়ে যান দ্রুত। লাশের গোসল দেয়ার কাজেও পিছিয়ে থাকেননি। শুধু তাই নয়, নিজের অসুস্থ স্ত্রীকে অনেক মহিলা রোগীর পাশে থাকার জন্য পাঠিয়ে দেন বাড়িতে কিংবা হাসপাতালে।
১৩.৯.২০০২ খ্রিঃ তার গ্রামের এক সহপাঠি তার বাবার অসুস্থতার কথা বলেন এবং হাসপাতাল নিয়ে যাবার মত কোনো ব্যবস্থা নেই বলে জানান। তখন তিনি অখিল ঘোষ নামক ওই রোগীকে কুলাউড়ায় খ্রিস্টিয়ান মিশনারী হাসপাতালে নিয়ে যান চিকিৎসার জন্য। ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত ওই ব্যক্তি ৭ দিনের মধ্যে মারা যান। ২৩.৩.২০০৪ খ্রিঃ অস্বাভাবিক ভাবে পেট ফুলে যাওয়া রোগী একই গ্রামের আব্দুর রূপকে নিয়ে মিশন হাসপাতালে যান। ০৩.০১.২০০৮ খ্রিঃ টিলার উপর থেকে প্রায় ৭০ ফুট নিচে পড়ে আটকে থাকা জাবরুল হোসেনকে উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করান। তখন মানুষের অনুরোধে মাঝে মধ্যে রোগী নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল যেতেন। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম রোজায় তার স্ত্রীর গলায় মাছের কাটা আটকে যায়। এরপর কোমরের হাড়েও সমস্যা দেখা দেয়। একাধারে চার বছর স্ত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডাক্তারের চেম্বারে যাওয়া আসা করেন। এর ভিতর স্ত্রীর গলায় ৩ টি ও কোমরে একটি অপারেশন করা হয়। স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতাল ও ডাক্তারের চেম্বারে যাওয়া আসাকালে অন্যান্য রোগীর দুঃখ, দুর্দশা, দুর্ভোগ ও আর্থিক সমস্যা তিনি স্বচক্ষে উপভোগ করেন। অসহায় রোগীর আহাজারী তাকে ভীষণ ভাবে পীড়া দিত। তাদের কষ্ট দেখে নিজে কষ্ট অনুভব করতেন। সেই থেকে তিনি অসহায় দরিদ্র রোগীর চিকিৎসা সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। একপর্যায়ে রোগীর সেবা তার নেশায় পরিণত হয়। অনেক রোগী তাকে ছাড়া যান না। জরুরী রোগীর জন্য নিজের কাজ ফেলে চলে যান। রাত-দিন সবই তার কাছে সমান। ফোন আসলেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন কোথায় নিয়ে যাবেন, কোন ডাক্তার দেখাবেন, রোগীর নিকট কত টাকা আছে, বাকী টাকার জন্য কার কার কাছে ফোন করে হাত পাতবেন, রক্তের জন্য কাকে কাকে ফোন করবেন ইত্যাদি কাজে।
এ পর্যন্ত তার রোগীর সংখ্যা এক হাজার পনের। জুড়ী, কুলাউড়া ও বড়লেখা উপজেলার রোগী নিয়ে কুলাউড়া, মৌলভীবাজার, সিলেট ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে চিকিৎসা করানো, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অপারেশনের ব্যবস্থা করেন। কম মূল্যে উন্নত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সিলেটের প্রায় সকল হাসপাতালের অধিকাংশ ডাক্তার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে চিনেন। অনেক ডাক্তার তার রোগী থেকে ভিজিট কম নেন। অনেকে ভিজিট নেন না। হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেয়া রোগীর বিল কমানোর জন্য বিভিন্ন টেবিলে দৌড়ঝাপ করেন। শতাধিক রোগীর রক্তের ব্যবস্থা করে দেন। এপর্যন্ত ৭৯ জন লাশের গোসল করান তিনি। রোগী ছাড়াও অন্য যে কোনো মানুষের যে কোনো সমস্যায় তিনি পাশে দাঁড়ান। সাধ্যমতো সহযোগিতা করেন। শুধু তাই নয়, গ্রামে গরু চুরি ঠেকাতে রাত জেগে পাহারাও দিয়ে থাকেন। সেই সাথে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া যে কোনো অন্যায়, অপরাধ বা মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন ও প্রতিরোধ গড়ে তুলেন।
কালিনগর গ্রামের বাসিন্দা হতদরিদ্র হাওয়া বেগম (৪৫)। অন্ধত্বের কারণে তার বিয়ে হয়নি। তিনি বলেন- আমার ঘাড়ে একটি ফোড়া হয়েছিল। ৩/৪টি হাসপাতাল ঘুরে প্রতিবন্ধী ভাতার প্রাপ্ত ২০/২৫ হাজার টাকা খরচ করে কোনো ফল পাইনি। গ্রামবাসী বলছিল আমার ক্যান্সার হয়ে গেছে, আর ভালো হতে পারব না। অবশেষে কবির ভাইয়ের মাধ্যমে সিলেট একটি হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা করিয়ে আমি সুস্থ হয়েছি। তিনি নিজের পকেটের টাকা ও বিভিন্ন মানুষ থেকে সহযোগিতা নিয়ে হাসপাতালের বিল ২৪ হাজার টাকা পরিশোধ করেন।
কুলাউড়া উপজেলার গোগালীছড়া গ্রামের বাসিন্দা শাহীন আহমদ বলেন- আমার ছেলে সাদিক আহমদ (৮) ২/৩ মাস ধরে প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত বমি করতো। অনেক ডাক্তারের নিকট চিকিৎসা করিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধে অনেক টাকা খরচ করেছি, কিন্তু রোগ কমেনি বা ডাক্তারগণ কোনো রোগ ধরতে পারেননি। অবশেষে কবির ভাইয়ের মাধ্যমে সিলেটে একজন ডাক্তার দেখাই। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই মাত্র ২৮৮ টাকার ওষুধে আমার ছেলে এখন পুরোপুরি সুস্থ।
এক প্রতিক্রিয়ায় সালমান কবির বলেন, মানুষের জন্য কাজ করাটা সৌভাগ্যের। অনেক হতদরিদ্র পরিবারে মৃত্যু পথযাত্রী কিংবা লাশের পাশে রাত কাটানোর কোনো মানুষ মিলে না, সেখানে আমি রাত কাটাই। অতিগরিব পরিবারে কোনো লাশের গোসল করাতে কোনো মানুষ মিলে না বা কেহ যায় না। এমন লাশের গোসল আমি করাই। এগুলো করি আল্লাহর ওয়াস্তে। একাজ করতে গিয়ে আর্থিক, শারীরিক ও পারিবারিক ভাবে ক্ষতির শিকার হই তবে মানসিক তৃপ্তি পাই।
জুড়ী উপজেলা প্রেস ক্লাব সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, সালমান কবির একজন মানবিক মানুষ। তিনি সর্বদা মানবসেবায় নিয়োজিত। সামাজিক কাজের পাশাপাশি ধর্মীয় কাজেও সমান পরিশ্রমী।
জায়ফরনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাছুম রেজা বলেন, সালমান কবির নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ান। অসহায় মানুষের সেবা করেন। হতাশাগ্রস্থ মানুষজন আশাবাদী হন। তার এই কাজ গুলো অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। এসব মানবিক কাজে যুবসমাজের এগিয়ে আসতে হবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/মঞ্জুরে/এসডি-০১




