সিলেট নগরীতে প্রতিদিন উৎপাদিত বর্জ্যের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি চলে যাচ্ছে সিটি করপোরেশনের হিসেবের বাইরে। দিনে গড়ে ৪৭৫ টন বর্জ্য উৎপাদন হলেও করপোরেশনের ভ্যানে উঠছে মাত্র ৩০০ টন। বাকি ১৭৫ টন বর্জ্য যাচ্ছে কোথায়? ড্রেন, খানাখন্দ আর সুরমা নদীতে উপচে পড়া এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য দিনে দিনে রূপ নিচ্ছে পরিবেশ বিপর্যয়ে। এদিকে বিপুল কর্মী বাহিনী নিয়ে বছরে প্রায় সোয়া ১২ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে সিলেট সিটি করপোরেশনকে (সিসিক)।
 

সিসিকের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন বলেন,নগরবাসীর কাছ থেকে সরাসরি কোনো পরিচ্ছন্নতা ফি নেওয়া হয় না। কেবল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল থেকে বছরে আদায় হয় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বিপরীতে শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতন-ভাতাতেই বছরে খরচ দাঁড়ায় ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ফলে বছরে নিট সোয়া ১২ কোটি টাকা আর্থিক ঘাটতি বহন করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।  ৪২ টি ওয়ার্ড থেকেও শতভাগ হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় না হওয়ায় গভীর রাজস্ব সংকটে ধুঁকছে সিসিক।
 


দৈনিক ১৭৫ টন বর্জ্যের গোলকধাঁধা নিয়ে এ কর্মকর্তা জানান, নগরীর মোট উৎপাদনের প্রায় ৩৭ শতাংশ বর্জ্য রয়ে যাচ্ছে ব্যবস্থাপনার বাইরে। এর সামান্য অংশ টোকাই ও ভাঙারি ব্যবসায়ীরা কুড়িয়ে নেন, কিছু এলাকার বাসিন্দারা নিজ উদ্যোগে গর্তে ফেলেন। কিন্তু সিংহভাগই ফেলে রাখা হচ্ছে সড়ক ও খোলা জায়গায়। দিনে অন্তত এক থেকে দেড় টন ক্ষতিকর প্লাস্টিক সরাসরি ড্রেন হয়ে সুরমা নদীতে মিশছে, যার স্থায়ী দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের তলদেশেও।
 

অন্যদিকে প্রতিদিন সিলেট নগরীরর ৩০০ টন বর্জ্য সরাসরি নেওয়া হচ্ছে দক্ষিণ সুরমার লালমাটিয়া ডাম্পিং গ্রাউন্ডে। পুরো মহানগরের একমাত্র ময়লার ভাগাড় এটি। সেখানে জমে থাকা বর্জ্যের পরিমাণ ইতিমধ্যে প্রায় ১ লাখ টন ছাড়িয়েছে। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, খোলা আকাশের নিচে এই বর্জ্য পাহাড়ের ধারণক্ষমতা আর কতদিন টিকবে বা এর পরিবেশগত মেয়াদ কবে শেষ হবে—তা নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (স্টাডি) করেনি সিসিক।
 

১ হাজার টনের প্ল্যান্টে কাজ হচ্ছে মাত্র ১৫০ টন:
লালমাটিয়ায় দৈনিক ১ হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন মেটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি (এমআরএফ) প্ল্যান্ট থাকলেও তার ৮৫ শতাংশ ক্ষমতাই পড়ে রয়েছে অলস। দিনে মাত্র ১৫০ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয় সেখানে। সেখান থেকে প্রতিদিন ৫০ টন প্লাস্টিক ও পলিথিন আলাদা করে পাঠানো হচ্ছে ছাতকের লাফার্জহোলসিম সিমেন্ট কারখানায়। তবে এই বিপুল কাঁচামাল সরবরাহে সিসিকের বাড়তি কোনো রাজস্ব আয় নেই।

যানবাহন ও ভ্যানের সংকট নিয়ে ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন জানান, বর্জ্য অপসারণে বর্তমানে নিয়োজিত ৬০টি ভারী গাড়ির মধ্যে নিয়মিত ৫ থেকে ১০টিই নষ্ট থাকে। নগরীর জন্য অন্তত ১ হাজার ট্রলি ভ্যান প্রয়োজন হলেও রয়েছে অর্ধেকের মতো (৫০০-৬০০টি)। বিশেষ করে নতুন ওয়ার্ডগুলোর বেহাল সড়ক এবং জনসচেতনতার অভাবে শতভাগ এলাকায় ভ্যান সার্ভিস পৌঁছানো যাচ্ছে না।
 

তবে সংকটের মধ্যেও মেডিকেল বর্জ্য আলাদাভাবে ও সুরক্ষিতভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, জনসচেতনতা বাড়াতে মাইকিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে ভবিষ্যতে পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার স্থাপন এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের (ওয়েস্ট-টু-এনার্জি) প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/মআস