২০২০ সালের ১০ অক্টোবরের রাত। সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্র বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি। চার দেয়ালের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল এক যুবকের আর্তনাদ। সেই রাতে ফাঁড়ির ভেতরে ৩৩ বছর বয়সী রায়হান আহমদের ওপর চলছিল নির্মম নির্যাতনের তাণ্ডব। নগরের আখালিয়া এলাকার বাসিন্দা রায়হানকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার পর পরদিন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান তিনি।
ঘটনার শুরুতে পুলিশ দাবি করেছিল, ছিনতাইয়ের অভিযোগে রায়হানকে জনতা গণপিটুনি দিয়েছে। তবে পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। ছিনতাইয়ের কোনো ঘটনা ঘটেনি; বরং পুলিশ ফাঁড়ির ভেতরেই রায়হানের ওপর চালানো হয়েছিল ভয়াবহ নির্যাতন।
ময়নাতদন্তে রায়হানের শরীরে মোট ১১১টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৯৭টি স্থানে মারাত্মক ফোলা ও রক্তজমাট বাঁধার আলামত এবং ১৪টি স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাঁর আঙুলের নখও উপড়ে ফেলার আলামত পাওয়া যায়। আদালতের বর্ণনা অনুযায়ী, অতিরিক্ত নির্যাতনের প্রভাবে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো বিকল হয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়।
রায়হানের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ঘটনার রাতে ফাঁড়ি থেকে ফোন করে তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে টাকা চাওয়া হয়েছিল। পরিবারের এক আত্মীয় টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে গেলেও তাঁকে জানানো হয়, দেরি হয়ে গেছে এবং রায়হানকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন। প্রাথমিক তদন্তে বন্দরবাজার ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ কয়েকজনকে বরখাস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
পরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৫ মে ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পিবিআই। একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শুরু হয় বিচারিক কার্যক্রম। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত ৬১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন।
অবশেষে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আবদুল মজিদ মুন্সী চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে মামলার প্রধান আসামি এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অপর একটি অভিযোগে তাঁকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
কনস্টেবল হারুন অর রশিদ ও কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাসকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া এএসআই আশেক এলাহী, এসআই মো. হাসান উদ্দিন ও সাংবাদিক আবদুল্লাহ আল নোমানকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
রায় ঘোষণার দিন ছয় আসামির মধ্যে শুধু এএসআই আশেক এলাহী আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। বাকি পাঁচ আসামি পলাতক থাকায় তাঁদের অনুপস্থিতিতেই রায় ঘোষণা করা হয়।
পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কনস্টেবল হারুন অর রশিদ ও টিটু চন্দ্র দাস এবং সাত বছরের সাজাপ্রাপ্ত এসআই হাসান উদ্দিন ও সাংবাদিক আবদুল্লাহ আল নোমান।
আকবর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তাঁর জামিন স্থগিত হলে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ অমান্য করে আত্মগোপনে চলে যান। এসআই হাসান উদ্দিনও জামিনে মুক্ত হয়ে পলাতক হন। আর হারুন ও টিটু কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
রায়হান হত্যা মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হয়েছে। তবে পাঁচ আসামি এখনও পলাতক থাকায় তাঁদের গ্রেপ্তার এবং সাজা কার্যকর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছেন রায়হানের পরিবার।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/মআস-০৫




