সিলেটে চলছে জ্বালানি তেল সংকট। সিলেটের ফিল্ডগুলোতে উত্তোলন বন্ধ ও চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে পরিবহন সমস্যায় এ সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ ১ বছরের বেশি সময় ধরে জ্বালানি তেলের এ সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারছেন না সিলেটের ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বার বার ধর্ণা এবং কঠোর আন্দোলনের দিয়েও সুরাহা পাচ্ছেন না তারা।

এ অবস্থায় সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) থেকে এক সপ্তাহের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন সিলেটের জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে সমস্যা সমাধানের বিষয়ে পদক্ষেপ না নিলে কঠোর আন্দোলনের ডাক দিতে বাধ্য হবেন বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন তারা।


বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে নবাগত জেলা প্রশাসক এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সভায় দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস প্রদান করেছেন জেলা প্রশাসক মো. মজিবুর রহমান।

জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীরা জানান, সিলেটে গত প্রায় দেড় বছর ধরে স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানি তেলের উৎপাদন বন্ধ। যে কারণে তেল সংকটে পড়েছেন এখানের ব্যবসায়ীরা। গত বছরের অক্টোবরে সিলেটে তেলের তীব্র সঙ্কট দেখা দিলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দফায় দফায় বৈঠক করে আন্দোলনের হুমকি দেয়ার পরে তেলের সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হয়। তবে পর্যাপ্ত ছিলো না এ সরবরাহ।

এরই মাঝে চলতি মাসের শুরুর দিকে আবারও সিলেটে তেলের সঙ্কট দেখা দেয়। এই সংকটের জন্য সংশ্লিষ্টরা সিলেটে উৎপাদন বন্ধ, চট্টগ্রামে তেলশূন্যতা ও রেল কর্তৃপক্ষের উদাসিনতায় ওয়াগন আসার অনিয়মকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যবসায়ীরা জানান, সিলেটে প্রতিদিন প্রায় ১০ লক্ষ লিটার জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান সরবরাহ অনুযায়ী মাত্র ৩ থেকে সােয়া ৩ লক্ষ লিটারের মতাে মতো পড়ে। সে তেল সিলেটের ৪টি ডিপাের মধ্যে ভাগ করে নেন তারা। এর জন্য কোনো কোম্পানিই তাদের গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করতে পারেন না।

সিলেটের পেট্রোল পাম্পগুলােতে জ্বালানি তেল আসে চট্টগ্রাম থেকে। সিলেটে তেল সরবরাহ রেলের ওয়াগন নির্ভর। সংশ্লিষ্টদের অভিযােগ, রেল বিভাগের উদাসিনতাও সিলেটে তেলের তীব্র সঙ্কটের একটি অন্যতম কারণ।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এক বছর পূর্বেও সিলেটের গ্যাস ফিল্ডসমূহের খনি থেকে উত্তোলিত কনডেনসেট থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন করে সিলেটের পাম্পগুলোতে সরবরাহ করা হতাে। সেসময় সিলেটে কখনাে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেয়নি। ১ বছরের বেশি সময় থেকে সিলেটের গ্যাসফিল্ড থেকে পাম্পে জ্বালানি সরবরাহ পুরােপুরি বন্ধ করে সিলেটের পাম্প মালিকদেরকে ওয়াগনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে জ্বালানি সরবরাহ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। সিলেটের গ্যাসফিল্ড থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন বন্ধ করাকে সিলেটবিদ্বেষী ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন সিলেটের জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীরা।

তেল বিপননকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সিলেটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে প্রতি সপ্তাহে ৩ থেকে ৪টি তেলবাহী ওয়াগন আসে। প্রতিটি ওয়াগনে গড়ে ৩ লক্ষ লিটার করে জ্বালানি তেল থাকে। তবে ওয়াগনগুলোর সিডিউলের কারণে কখনো ওয়াগন আসা বিলম্বিত হয়। এছাড়া কিছুদিন থেকে চট্টগ্রামেও তেলের ঘাটতি থাকার কারণে সিলেটে এমন সংকট তৈরি হয়েছে।

এদিকে, চলমান সংকট থেকে উত্তরণ ও সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে নবাগত জেলা প্রশাসক এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সভায় এক সপ্তাহের মধ্যে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস প্রদান করেন জেলা প্রশাসক মো. মজিবুর রহমান।

সভায় বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন এন্ড কনর্ভাসন ওয়ার্কশপ ওর্নাস এসোসিয়েশন, সিলেট বিভাগের নেতৃবৃন্দ সিএনজি ফিলিং স্টেশন ব্যবসায় বিরাজমান সুবিধা অসুবিধাসমূহ লিখিতভাবে জেলা প্রশাসকের কাছে তুলে ধরেন এবং এসব সমস্যা সমাধানে জেলা প্রশাসকের সহযোগিতা কামনা করেন।

সভায় সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বলেন, জ্বালানি খাত সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ খাতের সাথে জড়িত সিএনজি ও পেট্রল স্টেশন মালিকদের সুবিধা-অসুবিধা দেখা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।

মতবিনিময়কালে তিনি সিএনজি স্টেশন মালিক এসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ কর্তৃক উত্থাপিত সমস্যাসমূহ সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস প্রদান করেন।

মতবিনিময় সভায় সিলেট চেম্বারের সভাপতি তাহমিন আহমদ বলেন, সিলেটের সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিকগণ গ্যাসের অনুমোদিত লোড বৃদ্ধির জন্য জালালাবাদ গ্যাস, পেট্টোবাংলাসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দীর্ঘদিন থেকে দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে অতিরিক্ত গ্যাস বিক্রির কারণে বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হচ্ছে। যার জন্য সিলেটসহ সারাদেশের সিএনজি স্টেশন মালিকগণ খুবই উদ্বিগ্ন ও হতাশ।

বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জেলা প্রশাসকের সহযোগিতা কামনা করেন তাহমিন।

সিলেট চেম্বারের সাবেক সহ-সভাপতি জুবায়ের আহমদ চৌধুরী বলেন, দৈনিক ১২ ঘন্টা হিসেবে, মাসিক ২৬ দিনের লোড গণনার প্রক্রিয়া অযৌক্তিক, কারন প্রতিদিন গ্যাস বিক্রয় একরকম থাকে না। এছাড়াও দেশের ক্রমবর্ধমান যানবাহন বৃদ্ধির আলোকে জ্বালানির চাহিদা বিবেচনায় এ হিসাবটি বাস্তবতা বহির্ভূত। দেশের অন্যান্য গ্যাস বিপণন প্রতিষ্ঠানের ন্যায় জালালাবাদ গ্যাসের আওতাধীন সিএনজি স্টেশন সমূহের গ্যাস বিক্রয়ের লোড বৃদ্ধি করা একান্ত আবশ্যক। এ ব্যাপারে তিনি প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন।

জেলা প্রশাসক গ্যাসের লোড বৃদ্ধি এবং সিএনজি স্টেশন সমূহের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে বিষয়টি জরুরিভিত্তিতে সুরাহার লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার আশ্বাস প্রদান করেন।

মতবিনিময় সভা শেষে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস ডিস্ট্রিবিউটরস এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোলিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় মহাসচিব ও সিলেট বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের আহমদ চৌধুরী সিলেটভিউ-কে বলেন, সিলেটে জ্বালানি তেল সংকট একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে আমরা এক সপ্তাহের সময় বেঁধে দিয়েছি। আমরা আর পারছি না, আমাদের দেওয়া আশ্বাস পূরণ না করা হলে এক সপ্তাহ পর আমরা কঠোর আন্দোলনের ডাক দিতে বাধ্য হবো।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত দু সপ্তাহ ধরে তীব্র সংকট চলছে জ্বালানি তেলের। বুধবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) তেলবাহী কয়েকটি ওয়াগন সিলেটে আসলেও সেটি পর্যাপ্ত নয়। আমাদের প্রতিদিন প্রায় ১০ লক্ষ লিটার জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে পাই গড়ে প্রতিদিন মিলে মাত্র ৩ থেকে সােয়া ৩ লক্ষ লিটার।


সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম