সিলেটের খ্যাতিমান ও ক্লিন ইমেজের রাজনীতিবিদ, সিলেট-৩ আসনের তিন বারের সাংসদ মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী কয়েস সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যাওয়ার এক বছর। গত বছরের ১১ মার্চ ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। মরঘাতি ভাইরাস করোনা তাঁকে কেড়ে নেয় প্রিয়জনদের কাছ থেকে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৬৬ বছর।
গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে টিকা নেন মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী। তারপর কোনো শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল না। তবে টিকা নেওয়ার দুই সপ্তাহ পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ৭ মার্চ সিলেট থেকে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। ওই দিন রাতে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন সকালে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দেন তিনি। বিকালে তার ফলাফল পজিটিভ আসে। এরপর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ভেন্টিলেশনে নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১ মার্চ বেলা ২টা ৪০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী।
তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো সিলেটে শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর দীর্ঘ জীবনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, সুহৃদ-স্বজনসহ দল-মত নির্বিশেষ মানুষজন ছুটে যান ফেঞ্চুগঞ্জস্থ তাঁর নুরপুরের গ্রামের বাড়িতে।
মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েসের মরদেহ মৃত্যুর ঢাকা থেকে পরদিন (১২ মার্চ) দুপুরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। ওই দিন সকাল থেকে বিভিন্ন স্থান থেকে এমপি’র এলাকায় মানুষের আগমন শুরু হয়। পরে বিকেল সোয়া ৫টায় ফেঞ্চুগঞ্জের কাশিম আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ফেঞ্চুগঞ্জের কাশিম আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েসের জানাযা সম্পন্ন হয়। জানাজা শেষে বাড়ির সামনে পারিবারিক কবরস্থানের তাঁকে দাফন করা হয়।
জানাযা ও দাফনের আগে দিনভর দলীয় নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মাহমুদ উস সামাদের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এসময় কান্নায় ভেঙে পড়েন সবাই। সেদিন সেখানে এক হৃদয়বিদার দৃশ্যের অবতারণা হয়।
১৯৫৫ সালের ৩ জানুয়ারি ফেঞ্চুগগঞ্জে জন্ম নেওয়া মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ আসন থেকে প্রথমবারের মত সংসদ নির্বাচিত হন। এরপর দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী জাতীয় মহান সংসদের প্যানেল স্পিকার , প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদিশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং শেখ রাসেল শিশু কিশোর পরিষদের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।
মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েসের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালনে ব্যাপক কর্মসূচি :
মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েসের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালনে মরহুমের পরিবার, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা যুবলীগ, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের উদ্যাগে পৃথকভাবে শোকসভা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল ,খতমে কুরআন এবং শিরনি বিতরণসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
জানা গেছে, মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর পরিবারের পক্ষ থেকে ১১ মার্চ (শুক্রবার) বাদ ফজর থেকে ফেঞ্চুগঞ্জের নুরপুরস্ত দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী জামে মসজিদে খতমে কুরআন, বাদ জুম্মা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া মাহফিল, কবর জিয়ারত ও মসজিদে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। পরে মসজিদে শিরনি বিতরণ করা হবে।
বাদ আছর ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার জামে মসজিদে এমপি হাবিবুর রহমান হাবিবের উদ্যাগে দোয়া মাহফিল, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা যুবলীগের উদ্যাগে বাদ মাগরিব কদমতলি পয়েন্ট জামে মসজিদে দোয়া মাহফিল, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের উদ্যোগে ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারস্ত আকুল শাহ শপিং সেন্টার অফিসে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
পরদিন (১২ মার্চ) মরহুমের পরিবারের পক্ষ থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার সকল এতিমখানা ও মাদরাসায় শিরনি বিতরণ করা হবে। ১৩ই (রবিবার) দক্ষিণ সুরমা ও বালাগঞ্জ উপজেলার সকল এতিমখানা ও মাদরাসায় শিরনি বিতরণ করা হবে। ১৪ই মার্চ (সোমবার) বিকেলে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যাগে ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারস্ত মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী রিভারভিউ পার্কে মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী স্মরণে শোকসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। পরে বিতরণ করা হবে শিরনি।
এছাড়াও মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী স্মরণে শনিবার (১২ মার্চ) বাদ যোহর দক্ষিণ সুরমার কলাবাগান লতিফিয়া হাফিজিয়া ইবতেদায়ী মাদ্রাসায় 'ক্যাম্পেইন ফর জুয়েল আহমদ গ্রুপ'র উদ্যোগে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, ১২ মার্চ দক্ষিণ সুরমার কুচাই ইউনিয়নের শাহ আলী রাজা পরিবারের পক্ষ থেকে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, ১৩ মার্চ দক্ষিণ সুরমা উপজেলার লালাবাজার ইউনিয়নের পরগনা বাজারস্থ পাঞ্জেখানা মসজিদে পরগনা বাজার আঞ্চলিক আওয়ামী লীগের উদ্যাগে আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর ছোট ভাই, লন্ডন থেকে প্রচারিত বাংলা চ্যানেল 'চ্যানেল এস'র চেয়ারম্যান আহমেদ উস সামাদ চৌধুরী জেপি, ভাতিজা লন্ডন প্রবাসী সাকিব উস সামাদ চৌধুরী ও ভাগনা আমেরিকা প্রবাসী কমিউনিটি নেতা জুনেদ আহমদ চৌধুরী দেশে অবস্থান করে কয়েস চৌধুরীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী যথাযথভাবে পালনের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন।
এসব কর্মসূচি ছাড়াও সিলেট-৩ আসনের বিভিন্ন এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্যাগে বিভিন্ন মসজিদে শুক্রবার দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
অপরদিকে, মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েসের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালনে সিলেট-৩ আসনের বর্তমান এমপি হাবিবুর রহমান হাবিবও হাতে নিয়েছেন নানা কর্মসূচি। বৃহস্পতিবার (১০ মার্চ) রাতে এমপি হাবিবুর রহমান হাবিব সিলেটভিউ-কে জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই তাঁর নিজ বাড়িতে কুরআন খতম শুরু হয়। একটানা চলবে ফজর পর্যন্ত। ফজর পরে ও শুক্রবার জুম্মার নামাজের এমপি হাবিবের গ্রামের মসজিদে তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। পরে বিতরণ করা হবে শিরনি। এছাড়াও মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েসের পারিবারিক উদ্যোগে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচিতে তিনি অংশগ্রহণ করবেন এবং মরহুমের কবর জিয়ারত করবেন এমপি হাবিব। পরে মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করবেন।
উল্লেখ্য, করোনাকালে বাংলাদেশ যখন সাধারণ ছুটিতে বিপর্যস্ত। তখন নিম্ন আয়ের মানুষেরা অপেক্ষায় ছিলেন সরকারি ত্রাণ সাহায্যের অপেক্ষায়। তখনই সিলেট-৩ সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
দুর্যোগকালীন সময়ে নিজ এলাকায় থেকে এই সাংসদ সরকারি ত্রাণ সহায়তা বণ্টন নয়- নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ, তিনটি উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করা, স্থানীয় প্রশাসনকে পরামর্শ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণসহ নানা কাজে সরাসরি নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন সারাদিন। সে সময় মানবিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিলেন দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনের সাংসদ মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী।
দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকেই এলাকায় ছিলেন সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী কয়েস। প্রতিদিনই নিজ সংসদীয় এলাকার সংকটে পড়া মানুষদের মধ্যে খাদ্য সহায়তা বিতরণসহ নানা কর্মসূচিতে অংশ নিতেন তিনি। নিজে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদেরও নামিয়েছিলেন মাঠে। দুর্যোগকালীন সময়ে এই সংসদ সদস্যের এমন উদ্যোগ প্রশংসা কুড়ায় সবার।
গত বছরের ২২ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণার আগেই ঢাকা থেকে এলাকায় চলে আসেন মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী কয়েস। তখন করোনাকালীন লম্বাসময় তিনি এলাকায়-ই থেকেছেন। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে এই সাংসদকে।
দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী নিজ এলাকার জনগণকে সচেতন করতে প্রচারাভিযানও শুরু করেন। এ সময় করণীয় নির্ধারণে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে একাধিক বৈঠক করেন তিনি। লকডাউন ঘোষণার পর বিপাকে পড়া মানুষদের জন্য খাদ্য সহায়তা প্রদান করেন তিনি। এছাড়া ধান কাটার মৌসুমে নিজ এলাকার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ধান কাটতে মাঠে নামিয়েছিলেন। নিজেও অংশ নিয়েছেন ধান কাটায়। রমজান মাস শুরু হওয়ার পর অসহায় মানুষদের বাড়ি বাড়ি ইফতারসামগ্রীও পৌঁছে দিয়েছেন মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েস।
সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম




