আজ ২৬ মার্চ, দেশের মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাঙালিদের ওপর হামলা শুরু করলে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এদিন থেকেই গড়ে তোলা হয় শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ। এরপর দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় বিজয়। প্রতিষ্ঠিত হয় সার্বভৌম বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাদানের এই দিনেও সিলেটে মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশপ্রেমিক সকল মানুষের হৃদয়ে হচ্ছে রক্তক্ষরণ। কারণ- দীর্ঘ ৫ বছর ধরে সিলেটের একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা চত্বর গাড়ির দখলে!


দক্ষিণ সুরমার কদমতলিতে সিলেটের একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে ১৯৯৬ সালে শ্বেতপাথর দিয়ে পিরামিড আকৃতির স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিলো। এই স্মৃতিস্তম্ভের ওপর পতপত করে উড়তো দেশের লাল-সবুজ পতাকা। কিন্তু সংস্কারের নামে ৫ বছর আগে ভেঙে ফেলা হয় সেই স্থাপনা। এরপর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবহনকারী সেই ঐতিহ্যবাহী চত্বরটি পরিণত হয়েছে গাড়ির গ্যারেজে। এ যেন মুক্তিযুদ্ধের আবেগকে পিষ্ট করা হচ্ছে বাস-ট্রাক-লেগুনাসহ বিভিন্ন ভারি যানবাহনের চাকায়। একে তো সংস্কারে হচ্ছে দেরি, তার উপর গাড়ির গ্যারেজ নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই মাথাব্যথা। ফলে ক্ষোভ বাড়ছে সিলেটের মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে। ক্ষুদ্ধ সিলেটের সকল স্তরের সচেতন মানুষ।

সিলেট নগরীর প্রবেশদ্বার হুমায়ুন রশীদ চত্বর থেকে কয়েকশ গজ উত্তরে আরেকটি চত্বর- যা মুক্তিযোদ্ধা চত্বর নামে পরিচিত। পাঁচ বছর আগে উন্নয়নের স্বার্থে মুক্তিযোদ্ধা চত্বরের স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। তখন আরও সুন্দর এবং আকর্ষণীয় করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও নকশার জালে আটকে আছে স্মৃতিস্তম্ভের সংস্কার কাজ। সিসিক বলছে- পছন্দের নকশা মিলছে না!

সিলেটের একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা চত্বর ছুঁয়েই প্রতিদিন আঞ্চলিক ও দূরপাল্লার শত শত গাড়ি কদমতলীয় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে আসা-যাওয়া করে। ফলে হাজারো মানুষ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এই বিজয়স্মৃতি দেখে উদ্বেলিত হতেন। অন্যান্য স্থান থেকে সিলেটে আসা মানুষজন প্রবীণদের কাছে সিলেটকেন্দ্রিক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে চাইতেন। কিন্তু ৫ বছর আগে স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন স্তম্ভ নির্মাণ না করায় সেই কৌতুহল আর উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েছে।

স্থানীয়রা ক্ষোভের সঙ্গে জানান, এই চত্বরের স্থাপনা দেখে অনেকে আগে সিলেটে হওয়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাইতেন, জানতে পারতেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে চত্বরে স্মৃতিস্তম্ভ না থাকায় এখন আর কেউ এ নিয়ে আগ্রহ দেখায় না।

কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে মুক্তিযোদ্ধা চত্বর হয়ে তিনটি সড়ক দেশের বিভিন্ন জায়গায় গেছে। সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক ছাড়াও সিলেট-জকিগঞ্জ-গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার এবং সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ-মৌলভীবাজার সড়কের যানবাহন মুক্তিযোদ্ধা চত্বর ঘুরেই আসা-যাওয়া করে। ৫ বছর আগে নগরীর কিনব্রিজের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে সুরমা নদীর তীরবর্তী ঝালোপাড়া হয়ে মুক্তিযোদ্ধা চত্বর পর্যন্ত সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ নেয় সিসিক। এই সড়কটি ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রশস্ত করা ও নদীর তীরে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণের সময় মুক্তিযোদ্ধা চত্বরের স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলা হয়। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত চত্বরটি এখন গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান। পরিবহন শ্রমিকরা এখানে রাত-দিন গাড়ি রাখার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা চত্বরটি তারা ব্যবহার করেন গাড়ি ধোয়া-মোছার কাজেও। তাই এখানে সবসময় পানি জমে থাকে।

এ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও ক্ষোভ-হতাশা রয়েছে। বহুবার দাবি জানানোর পরও সিসিক এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়নি।

সিসিক সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের শুরুতে মুক্তিযোদ্ধা চত্বরের জন্য নকশা চেয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিলো। কয়েকটি নকশা পাওয়া গেলেও সেগুলো পছন্দ হয়নি। এরপর সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা চায় সিসিক। এখন দুটি ফার্মের নকশা দেখে তাদের বিস্তারিত দিতে বলা হয়েছে। নকশা চূড়ান্ত হলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।


সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম