সুনামগঞ্জের শস্যভান্ডার খ্যাত জগন্নাথপুরের হাওরগুলোর বোরো ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তার যেন শেষ নেই স্থানীয় কৃষকদের । বালুমাটি দিয়ে নিম্নমানের বেড়ি বাঁধ সামান্য বৃষ্টিতেই ধ্বসে পড়ছে। ভারতের চেরাপুঞ্জি থেকে নেমে আসা গেল  ক’দিনের পাহাড়ী ঢলে স্হানীয় নলজুড় নদীর পানিতে ভরে হাওরের বেড়ি বাঁধগুলোতে চাপ সৃষ্টি করছে। যে কোন সময় বাঁধগুলো ভেঙ্গে যাওয়ার আশংকা করছেন স্হানীয় কৃষকরা।

এলাকার অনেক কৃষকের অভিযোগ, প্রকল্পের মেয়াদের শেষদিকে তাড়াহুড়ো এবং সরকারি নিয়ম না মেনে বালুমাটি দিয়ে নিম্নমানের বেড়ি বাঁধ করা হয়েছে। বর্তমানে বৃষ্টি ও অকাল বন্যায় বাঁধগুলো ধ্বসে হাওরে পানি প্রবেশের আশংকা জাগাচ্ছে। নামমাত্র ও দায়সারা কাজ করে মোটা অংকের টাকা লুটপাট হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। কোন জবাবদিহিতা না থাকায় এসব কাজের ধারা নিয়মে পরিণত হয়েছে বলেও জানান তারা।


জানা গেছে, জগন্নাথপুরে বোরো ফসলরক্ষা ৩টি বেড়িবাঁধ ধ্বসে পড়েছে। ফলে হাওরের ফসল নিয়ে শঙ্কায় আছেন স্থানীয় কৃষকরা। সরেজমিনে দেখা যায়, নলুয়া হাওরের ফোল্ডার ৫-এর আওতাধীন ভুরাখালী সংলগ্ন বেড়ি বাঁধের কাজ হয়েছে খুব নিম্নমানের। এখানে দায়সারাভাবে মাটি ফেলা হয়েছে। বাঁধে কম্পেকশন ও দূর্বা ঘাস লাগানো হয়নি। এই পিআইসির সভাপতি হচ্ছেন ছাত্রলীগ নেতা জহিরুল। ১ হাজার মিটার বাঁধে বরাদ্দকৃত টাকা ১৬ লাখ টাকা। ইতিমধ্যে ৩ কিস্তিতে ৭ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে । পাহাড়ী ঢলের পানির চাপে বাঁধটি বর্তমানে খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে।
এ ব্যাপারে ছাত্রলীগ নেতা জহিরুল জানান, তিনি ক্ষতিগ্রস্হ বাঁধে মাটি ভরাটের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে মঙ্গলবার (৫ এপ্রিল) স্হানীয় পিংলার হাওরের বাধেঁ ফাটল ধরেছে বলে মাইকে ঘোষনা দেওয়া হয়। পরে জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষকরা স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

নলুয়া হাওরের ফোল্ডার—১ এর আওতাধীন মইয়ার হাওরের কলইকাটা নামক স্থানে ১৬ ও ১৭ নম্বর প্রকল্পের প্রায় ৩০ ফুট বাঁধ দেবে গেছে।

জানা যায়, জগন্নাথপুর উপজেলায় এবার সাড়ে তিন কোটি টাকা বরাদ্দে ২৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে ১৫ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধের কাজ করা হচ্ছে। তন্মধ্যে ১৬ নম্বর প্রকল্পে বরাদ্দ ১৩ লাখ টাকা এবং ১৭ নম্বর প্রকল্পের বরাদ্দ ২০ লাখ টাকা।

গেল কয়েক দিনের বৃষ্টিতে মই, নলুয়া ও পিংলার হাওরের ফসল রক্ষার ৩টি বেড়িবাঁধ ধ্বসে যায়। অধিকাংশ বেড়ি বাঁধ বালুমাটি দিয়ে দায়সারা তৈরি করা হয়েছে । এরআগেও একই স্থানে আরও কয়েকবার মাটি ধসে পড়েছে বলে জানান স্থানীয় কৃষকরা।

আতংকিত কৃষকরা জানান, বাঁধ ভেঙে গেলে নলুয়া, পিংলা ও মই হাওরের পুরো ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হাওর বাঁচাও আন্দোলন জগন্নাথপুর উপজেলা কমিটির আহবায়ক সিরাজুল ইসলাম জানান, হাওরের বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধে বালুমাটি ব্যবহার করা হয়েছে। কমপ্রেকশন ও দূর্বা ঘাস লাগানোর কথা থাকলেও এগুলো করা হয়নি। নামমাত্র মাটি ফেলে ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা লুটপাট করা হচ্ছে।

বালুমাটি দিয়ে দায়সারা বেড়ি বাঁধ তৈরির বিষয়টি সঠিক বলেন জানালেন নলুয়া ও মই হাওরপাড়ের ছিলাউরা হলদিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুল। তিনি বলেন, বাধঁগুলোতে কমপ্রেকশন ও দূর্বাঘাস লাগানোর কথা থাকলেও এগুলো করা হয়নি। বাঁধগুলো বর্তমানে খুবই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রতিবছরের মত এবারও নিম্নমানের কাজ করে মোটা অংকের টাকা লুটপাট করা হচ্ছে।

১৬ নম্বর প্রকল্পের সভাপতি বিপ্লব চন্দ্র দাস বলেন, তার প্রকল্পের বেড়িবাঁধ সামান্য অংশ ধ্বসে গেছে। তিনি সংস্কার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

১৭ নম্বর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, তার প্রকল্পের বেড়িবাঁধটি  ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং এখানে একটি গর্ত রয়েছে। এখানে মাটি না টেকার কারণে ধসে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তিনিও সংস্কার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের জগন্নাথপুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ সহকারী প্রকৌশলী হাসান গাজী বলেন, ‘যে বাঁধগুলো ধ্বসে যাচ্ছে আমরা দ্রুত মেরামতের চেষ্টা করছি।’
 
মঙ্গলবার দুপুরে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা সাজেদুল ইসলাম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো মেরামতের কাজ চলছে। এসব এলাকায় সার্বক্ষণিক তদারকি চলছে।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/পিডি