শিক্ষকতার মত একটা মহান পেশার মোহে পড়ে বাড়ি-ঘর, পরিবার-পরিজনের মায়া ত্যাগ করেছেন। দীর্ঘ ৩৩টি বছর ধরে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জনাব আব্দুর রশীদ।
শিক্ষকতা জীবনের ২৬টি বছর কাটিয়ে দিলেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনুন্নত একটি বিদ্যালয়ে। গোবিন্দশ্রী দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়ে গণিত শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর শহরের অনেক উন্নত বিদ্যালয় থেকে চাকরির প্রস্তাব আসে। কিন্তু নিজের ব্যক্তি স্বার্থের কথা তোয়াক্কা না করে বিবেকের তাড়নায় থেকে গেলেন উন্নত নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত পল্লীর অচেনা এই পরিবেশে।
যদিও শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন সকলের কাছে বন্ধুতূল্য তবে রীতিমতো লেখাপড়া না করা আমিসহ আমার কিছু সহপাঠীদের কছে ছিলেন সাক্ষাৎ যমদূত। যথারীতি লেখাপড়ায় অমনোযোগী হওয়ায় একদিন প্রচুর বকাঝকা আর কিছুটা উত্তমমাধ্যম দেওয়ার পর স্যার মাথা নিচু করে বসে থাকলেন। খেয়াল করে দেখলাম স্যার কাঁদছেন। কিছুক্ষণ পর স্যার উঠে এসে আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে দরদী কণ্ঠে বললেন, ‘এই যে আমি এত বকাঝকা আর শাসন করি তাতে তোমাদের যতটা কষ্ট হয় তার চেয়ে বেশি কষ্ট আমি উপলব্ধি করি। এই যে তোমরা আমার কথা শুনিসনা, লেখাপড়ায় ফাঁকিবাজি করিস, তোরা কি মনে করিস আমাকে ফাঁকি দিচ্ছিস? মোটেও না তোরা বস্তুত নিজেদের ফাঁকি দিচ্ছিস।’
স্যার এভাবে আবেগে কথাগুলি বলতে থাকলেন আর আমরা নিশ্চুপ শুনতে থাকলাম। এক পর্যায়ে স্যার বলেই দিলেন তোমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন আমি এত মাথা ঘামাই? কি লাভ আমার তোমাদের সফলতায়? তোমরা লেখাপড়া করে অনেক বড় মাপের মানুষ হয়ে কেউ কি আমার খোঁজ নিবি। যখন অবসর জীবনে বয়সের কারণে নানা রোগ শোকে সুদূর টাঙ্গাইলে বসে তোমাদের কথা বারবার স্মরণ হবে, তোমাদের কারো কারো মুখের ছবি আমাকে পীড়া দিবে না দেখার যন্ত্রণায় ঠিক তখন তোমরা হয়তো সময়ের পরিবর্তনে ভুলে যাবে আমায়।’
স্যারের কথাই সত্য হলো। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস অবসরের আগেই স্যার একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ দিন ধরে টাঙ্গাইলের বাড়ি আর ঢাকার হাসপাতালে চিকিত্সা নিচ্ছেন। মনে হয় রোগের তীব্রতা যতটা না স্যারকে কষ্ট দিচ্ছে তার চেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে দীর্ঘ চাকরি জীবনের আবেগ ভালবাসা জড়িত বিদ্যালয় ও তাঁর প্রিয় শিক্ষার্থীদের না দেখার যন্ত্রণা। একজন শিক্ষক হিসেবে যে সম্মানী তিনি পেতেন তা দিয়ে পরিবারের ভরণপোষন কোন মতে চলেছে, কিন্তু বর্তমান এই চরম দুঃসময়ে স্যারের চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করা রীতিমত দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্যারের এক জন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে সকল সাবেক- বর্তমান শিক্ষার্থীসহ সকল মানবিক হৃদয়ের মানুষের কাছে একজন অসুস্থ শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছি।
স্যারের সাথে যোগাযোগের নম্বর: ০১৭১৬৫৫১৯৭৪
পরিশেষে মহান রাব্বে কারিমের কাছে স্যারের সুস্থতা কামনা করি।
লেখক: শেখ মনজুরুল হক, সাবেক শিক্ষার্থী, গোবিন্দশ্রী দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়।
সাবেক ছাত্রবৃত্তি বিষয়ক সম্পাদক, সিলেট জেলা ছাত্রলীগ।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/পিডি




