“আমি আমার জীবনকে নিয়ে গর্বিত। অনেকে হয়তো একে আত্মগরিমা বলবেন। কিন্তু এটা অন্যায় নয়। বরং এরজন্য নিজেকে গড়ে তুলতে হয়......।”
১৬ই মার্চ ২০২২। জীবনে শেষবার সেদিন মঞ্চে ওঠেছিলেন আবুল মাল আব্দুল মুহিত। সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সেদিন তাঁকে দেওয়া হয়েছিল ‘গুণীশ্রেষ্ঠ সম্মাননা’। নগরীর ক্বিনব্রিজ এলাকায় চাঁদনীঘাটে সেই অনুষ্ঠানে নিজের জীবন নিয়ে গর্বের কথা জানিয়েছিলেন মুহিত। বলেছিলেন, তাঁর জীবন ‘মহাতৃপ্তি আর মহাপ্রাপ্তির’।
গর্ব, তৃপ্তি আর প্রাপ্তির জীবন শেষে অনন্তের পথে এখন মুহিতের যাত্রা।
৮৮ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন পেরিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী, সিলেট-১ আসনের সাবেক সাংসদ ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আবুল মাল আব্দুল মুহিত। শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৫৬ মিনিটে ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
আবুল মাল আব্দুল মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৫২ সালের ভাষাসংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার সলিমুল্লাহ হলের ছাত্রসংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (সিএসপি)-এ যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু হয় আবুল মাল আব্দুল মুহিতের। অর্থনৈতিক পরামর্শক হিসেবে ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রস্থ পাকিস্তান দূতাবাসে যোগ দেন তিনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জুন মাসে ইস্তফা দেন পাকিস্তানের চাকরি থেকে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
আবুল মাল আব্দুল মুহিত স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে পরিকল্পনা সচিব এবং ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগে সচিব পদে নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৮১ সালে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও ইফাদ (আইএফএডি)-এ কাজ শুরু করেন।
১৯৮২-৮৩ ও ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে এরশাদ সরকারের আমলে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। ওই সময়ে দেশের দুটি বাজেট দেন তিনি। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন মুহিত। সেসব শেষে তিনি যোগ দেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে।
মুহিত সর্বপ্রথম জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ২০০১ সালে। সেবার সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপির সাইফুর রহমানের কাছে পরাজিত হন তিনি। এরপর ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফের প্রার্থী হয়ে জয়ের মুখ দেখেন তিনি। ২০০৯ সালের শুরুর দিকে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মুহিত। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন তিনি। ওই দফায়ও তাঁকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন শেখ হাসিনা।
মুহিত ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত টানা ১০টি বাজেট পেশ করেছেন; যা বাংলাদেশে কোনোও অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে একটি রেকর্ড। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সাথে একটি রেকর্ডে নাম আছে মুহিতের। দেশে সর্বোচ্চ ১২ বার বাজেট প্রদানের রেকর্ড সাইফুর ও মুহিতের।
প্রায় ষাট বছরের কর্মময় জীবন ছিল মুহিতের। লেখালেখিতেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। ইংরেজিতে ১২টিসহ তিনি ৩৫টি বই লিখেছেন।
গেল মার্চ মাসে সিলেটে এসেছিলেন মুহিত। প্রায় আড়াই বছর পর সেবার ওই সংবর্ধনায় যোগ দিতেই ঢাকা থেকে নিজের জন্মভূমিতে আসেন তিনি।
এবার আরেকবার ফিরছেন, শেষবারের মতো; তবে নিথর, নিষ্প্রাণ হয়ে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/আরআই-কে




