(ফাইল ছবি)
গত দুই বছরের চারটি ঈদই বাবা ছাড়া মলিন কেটেছে ফাইয়াজ মাহমুদ ও আবদুল্লাহ মাহমুদের। স্বামী ছাড়া এই ঈদগুলো নিরানন্দ হয়েছে চৌধুরী রিফাত জাহানেরও। ঈদ অন্যদের জন্য আনন্দ বয়ে নিয়ে আসলেও এই দিন তাদের চোখে ঝরায় জল।
তারা সিলেটে করোনায় প্রথম প্রাণ কেড়ে নেওয়া ব্যক্তি ডা. মঈন উদ্দিনের স্ত্রী ও সন্তান।
ঈদের আগে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে চৌধুরী রিফাত জাহান বলেন, ‘তাঁকে ছাড়া আমাদের খুব কঠিন সময় কাটছে। বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য বিষয়টি আরও কঠিন।’
২০২০ সালের ৫ এপ্রিল সিলেটে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মঈন উদ্দিন। পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের মারা যাওয়ার ঘটনাও ছিল এটি প্রথম।
মঈন উদ্দিনের স্ত্রী চৌধুরী রিফাত জাহান জানান, ঈদের সময়টাতে অবসর বেশি পাওয়ায় বাবাকে ঘিরেই দুই ছেলে আনন্দে মশগুল থাকত। আজসহ ঈদগুলোতে তারা বাবাকে প্রচণ্ড মিস করেছে। ভবিষ্যতেও করবে। বাবা ছাড়া ঈদের আনন্দ তাদের কাছে এখন ফিকে।
ঈদের দিন বা আগের দিন গ্রামের বাড়ি সপরিবার চলে যেতেন মঈন। গ্রামের মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতেন। ছোটদের সালামি দিতেন, গ্রামের অসহায় পরিবারের সদস্যদের ঈদ উপহার দিতেন। মঈনের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিনের এ ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে।
ব্যস্ত চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়স্বজনের জন্য ঈদের পোশাক কেনাকাটা করতেন মঈন। সন্তানদের নিয়ে ঈদের জামাতে যেতেন। এখন ঈদ আসে, কিন্তু তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের মনে আর আনন্দ আসে না। মঈন উদ্দিনের কবরের পাশে গিয়ে জিয়ারতের মাধ্যমেই ঈদের সুখ খুঁজেন তারা।
স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে মঈন সিলেট নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকায় থাকতেন। এখন শূন্য পড়ে আছে তাঁর পড়ার কক্ষ। শেলফের তাকে তাঁরই সংগ্রহে থাকা চিকিৎসাশাস্ত্রের বই-পুস্তক থরে থরে সাজানো। বারান্দায় বাতাসে দুলছে টবে থাকা গাছগুলো। বারান্দায় অলস পড়ে আছে দুটি প্লাস্টিকের চেয়ার।
স্ত্রী জানান, মঈনের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল বাসার বারান্দা। মঈন ছিলেন খুবই ব্যস্ত চিকিৎসক। প্রতিদিন রাত দুইটা বা আড়াইটায় বাসায় আসতেন। তবে প্রতি বৃহস্পতিবার দুই ছেলের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতেন। ছেলেরাও বাবাকে ওই দিন কাছে পেয়ে আনন্দে মশগুল থাকত। সপ্তাহের ওই দিনে তাঁরা একসঙ্গে খেতেন।
মঈন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নাদামপুর গ্রামে ১৯৭৩ সালের ২ মে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৪ সালে তিনি ওসমানী মেডিকেল কলেজে সহকারী অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। তাঁর ব্যক্তিগত চেম্বার ছিল সিলেট নগরীর সোবহানীঘাট এলাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে।
চিকিৎসক হওয়ার পর মাসের একটি নির্দিষ্ট দিন গ্রামে যেতেন মঈন। সেখানে ওই দিন কয়েক শ অসহায় ও দরিদ্র মানুষকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিতেন। এমনকি ওষুধ কেনার জন্য টাকাও দিতেন। দরিদ্র মানুষকে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি নানা ধরনের সহযোগিতা করতেন। ফলে এলাকায় তিনি ‘মানবিক চিকিৎসক’ এবং ‘গরিবের ডাক্তার’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। নিজের চেম্বারেও গরিব রোগীদের বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতেন মঈন।
পরিবার জানায়, মঈন সব সময়ই মানুষের কল্যাণের জন্য ভাবতেন, তাই তাঁর সংগ্রহে থাকা চিকিৎসাশাস্ত্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই ওসমানী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া হয়েছে।
মঈনের বড় ছেলে ফাইয়াজ মাহমুদের বয়স ১৫ বছর, ছোট ছেলে আবদুল্লাহ মাহমুদের ৯ বছর। স্ত্রী চৌধুরী রিফাত জাহান সিলেট নগরীর কাজিরবাজারস্থ পার্ক ভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিওলজি বিভাগের প্রধান।
সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম




