ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের সিলেট মহানগরীসহ জেলার বেশিরভাগ উপজেলা পড়ে বন্যার কবলে। পুরো এক সপ্তাহ থৈ থৈ পানিতে বসবাসের পর গত ৩ দিন থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে অনেকে এলাকায় পানি পুরোপুরি নেমে যায়নি। সিলেট মহানগরীর অপেক্ষাকৃত নিচু এবং সুরমা নদীসংলগ্ন এলাকা এখনও নিমজ্জিত রয়ে গেছে।
বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে কিছু পরিবার বাসা-বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন। তবে এখনও অনেক মানুষ রয়ে গেছেন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে।
জানা গেছে, সিটি করপোরেশন এলাকায় যেসব এলাকায় পানি কমেছে সেসব এলাকায় মানুষজনকে পোহাতে হচ্ছে নানা ভোগান্তি। পচা পানির উৎকট দুর্গন্ধ, ময়লা-আবর্জনার বাগাড় আর মশা-মাছির উপদ্রব। এ অবস্থায় সিলেট সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ দ্রুত কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের অভিযোগ।
সোমবার (২৩ মে) সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ১৩ নাম্বার ওয়ার্ডের জামতলা-তালতলা এলাকা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, তালতলা থেকে জামতলার ভেতরে যে সড়ক ঢুকেছে তার পূর্ব পাশে গুলশান সেন্টার, মাহফুজ ট্র্যাভেলসের সম্মুখভাগ জলমগ্ন। কালচে পানি থেকে বেরুচ্ছে দূর্গন্ধ।
ফুড অ্যান্ড ক্রাফটের স্বত্বাধিকারী ব্যবসায়ী শামি আহমেদ বলেন- পানি কিছুটা নামলেও দূষিত জিনিস, ময়লা এখনো বাড়িঘরের বারান্দার মধ্যে রয়েছে। কাউন্সিলর কিংবা দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি এই অবস্থা পরিদর্শনের জন্যে আসেননি।
তিনি আরো বলেন- পানি উঠে তার দোকানের মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কোনো কাউন্সিলর বা এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এসে সহানুভূতিটুকুও জানাননি। এছাড়া, দূর্গন্ধযুক্ত পানির কারণে মশার উৎপাত অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঘরের ভেতর মশার কামড়ে টেকা দায়!
রাতুল ভ্যারাইটিজ স্টোরের মালিক গৌর চন্দ্র রায় জানান তিনি জামতলা এলাকার বাসিন্দা। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাসা পানিতে ডুবে গিয়েছিলো। ঘর থেকে পানি কমলেও তার ঘরের উঠানে এখনো পানি আটকে আছে। ঘরের ভেতর পানি ওঠায় আসবাবপত্র নষ্ট হয়েছে। দোকানের মালামাল নষ্ট হয়েছে।
পানিতে ডুবে যেতে থাকা মালামাল সরানোর সময় তিনি পায়েও আঘাত পেয়ে আহত হয়েছেন। এলাকার সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের কারো দেখা না পেয়ে গৌর চন্দ্র রায় হতাশা ব্যক্ত করেন।
এদিকে, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ১৫ নাম্বার ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত যতরপুর-সোবহানিঘাটের বন্যা কবলিত মানুষকে নগরীর মিরাবাজারের কিশোরী মোহন (বালক) উচ্চবিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে খোলা হয়েছে। বর্তমানে এই আশ্রয়কেন্দ্রে ৭২টি পরিবারের প্রায় ৪৫০ জন মানুষ আছেন। এতে শুরুতে ৮৫টি পরিবার এসে উঠেছিলো। কিছু কিছু জায়গায় পানি নেমে যাওয়ায় কিছু মানুষেরা বাসা-বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন।
আশ্রয়কেন্দ্রটি ঘুরে দেখা গেছে, চার তলা দালানের সব কক্ষে মানুষ রয়েছেন। ছোটো ছোটো বাচ্চারা এদিকওদিক ছোটাছুটি করছে। আশ্রয়কেন্দ্রে আসা আব্দুল গফুর জানান, আশ্রয় কেন্দ্রে এক সপ্তাহ ধরে আছেন। আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট। যারা ঘরবাড়িতে ফিরে গিয়েছেন তাদের ঘরের ভেতর এখনো পানি রয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা কুরবান জানান, আশ্রয় কেন্দ্রে নারী-শিশুদের জন্যে পরিবেশ খুব সন্তোষজনক নয়। তিনি আগামি সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হলে ঘরে ফিরতে পারবেন বলে আশাবাদি।
যতরপুরের হিরা মিয়ার কলোনি থেকে আশ্রয় কেন্দ্রে ওঠা মোহাম্মদ জিন্নুর মিয়া বলেন, কাউন্সিলরের পক্ষ থেকে এক বেলা এবং সিটি কর্পোরেশন থেকে এক বেলা খাবার প্রতিদিন সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, বন্যায় তাদের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটা সামলে ওঠার সাধ্য তাদের নেই। তাদের ঘরের সব আসবাব বন্যার পানিতে ডুবে ব্যবহারের অনুপযোগি হয়ে পড়েছে। ঘরের ভেতর পানি ঢুকে ঘরকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে।
বন্যা আক্রান্ত এলাকা যতরপুর থেকে আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই পাওয়া নারী সুফিয়া জানান এক সপ্তাহ ধরে আশ্রয় কেন্দ্রে আছেন। স্থানীয় কাউন্সিলর আশ্রয় কেন্দ্রের জন্যে প্রতিদিন খাবার পাঠাচ্ছেন। ১৩, ১৪, ১৫ নাম্বার ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর শাহানা আক্তার শানু বন্যা কবলিত মানুষের কাছে আসেননি বলে জানিয়ে নিজের হতাশা প্রকাশ করেন সুফিয়া।
আশ্রয় কেন্দ্রের খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকা হেলাল জানান, কাউন্সিলর বিদেশে অবস্থান করলেও তার ব্যক্তিগত সহকারী সুজন, আত্মীয় সেলিম রাজা, ওয়াহিদ নিয়মিত আশ্রয় কেন্দ্রে এসে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
হেলাল আশা প্রকাশ করে জানান, দুয়েকদিনের মধ্যেই পানি নেমে গেলে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে সবাই যার যার ঘরে ফিরতে পারবেন।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ৭টি ওয়ার্ডে মোট ১৬টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অনেকেই নিজ নিজ ঘরবাড়িতে ফিরছেন। তবে বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া এলাকাগুলোতে প্রচুর দুর্গন্ধ এবং মশার উৎপাত নিরসনে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কোনো কর্মকাণ্ড শুরু না হওয়ায় নাগরিকদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
সিসিকের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান সোমবার বিকেলে সিলেটভিউ-কে বলেন, বন্যার পানি কমতে শুরু করায় অনেক পরিবার তাদের নিজ ঘরে ফিরে গেছেন। যারা এখনও আছেন তাদের দেখ-ভাল করছে সিসিক।
তিনি বলেন, যেসব এলাকায় পানি কমেছে সেসব এলাকায় পচা দুর্গন্ধ ও ময়লাআবর্জনা জমেছে এটা ঠিক। মঙ্গলবার (২৪ মে) থেকে এসব এলাকায় ব্লিচিং পাউডার ছিটানো হবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম / অলি / ডালিম




