তাহিরপুরে ত্রানের নৌকা দেখলেই বন্যাকবলিতরা হাত উচিঁয়ে ডাকছেন। ডাক না শুনলে সাতরিয়ে ত্রানবাহী নৌকা ধরার চেষ্টা করছেন। আবার কেউ সাঁতার কেটে কেউ গলাসমান পানিতে নেমে ত্রানের নৌকা ধরার চেষ্টা করছেন। সাতরিয়ে বা গলা সমান পানিতে নেমে কেউ কেউ ত্রান সংগ্রহ করতে পারলেও বেশিরভাগ নারী পুরুষ ফিরছেন খালি হাতে। বৃদ্ধ ও শিশুরা এ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না, ফিরছেন খালি হাতে। এমন চিত্র শুধু তাহিরপুরে নয়, পুরো জেলা জুড়ে। উপজেলার বিভিন্ন স্কুল ও আশ্রয় কেন্দ্রে শ শ মানুষ ত্রানের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাদের সামনে দিয়ে কোন নৌযান গেলেই দুই হাত উচু করে মিনতি করেন এবং চিৎকার করে বলেন স্যার জায়েন না, আমরা না খেয়ে আছি ত্রানের একটা প্যাকেট দিয়ে যান। 

 



গত দুইদিন ধরে আকাশে রৌদ উঠেছে। প্রছন্ড গরমও শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে অধিকাংশ বাড়ীঘর এবং উঠান থেকে পানি নেমেছে। এসব বাড়ী থেকে পানি নেমে গেলও চরম দূর্ভোগ দেখা দিয়েছে। কাদায় বসত ভরে গেছে। পা পালানোর যায়গাটুকু নেই ঘরে। কোনো উপায় না পেয়ে কাদার মধ্যেই রাত্রি যাপন করছেন বানবাসীরা। ভয়াল বন্যার আঘাতে অনেকের বাড়ী ঘর ভেঙ্গে গেছে। এসব বাড়ী ঘর টাকা পয়সার অভাবে মেরামত করতে পারছেন না বানবাসীরা। বানবাসীরা বলছেন, প্রতিদিনেই কিছু না কিছু শুকনো খাবার পাচ্ছি, শুকনো খাবার ছোট ছোট শিশু ও বৃদ্ধরা এখন আর খেতে চাচ্ছে না। শুকনো খাবারের টাকায় কিছু চাল এবং ডাল দিলে বানবাসীরা অনন্ত একবেলা খেতে পারতো।  


এইদিকে উপজেলার আশ্রয় কেন্দ্র সহ বন্যাকবলিত গ্রামগুলোতে পানিবাহিত রোগ দেখে দিয়েছে। সেই সঙ্গে বানবাসীর অনেক শিশু জ¦র ও পাতলা পায়খায় আক্রান্ত হচ্ছেন। আসবাপত্র এবং ঘরবাড়ী পুনসংস্থার করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবী জানিয়েছেন বানবাসীরা। বিদ্যুৎ সরাবরাহ উপজেলার কোন কোন ইউনিয়নে এখনও বন্ধ রয়েছে। নেটওয়ার্ক থাকলেও একেবারে দূর্বল। 

 


উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের উজ্জল মিয়া বলেন, এক প্যাকেট ত্রাণের আশায় হাওরের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকি। ঘরে ধান ছিল, পানিতে ডুবে গেছে। কিছু ধান রক্ষা করতে পারলেও এখন ভাঙ্গাতে পারছিনা। রান্নাঘর সহ বসতঘর পানির তলিয়ে ভেঙ্গে গেছে। গত তিনদিন ধরে শুধু চিড়া আর মুড়ি খেয়ে আছি।

 


গোলাবাড়ী গ্রামের তুষা মিয়া বলেন, মাঝে মধ্যে ত্রান হিসেবে পাচ্ছি চিড়া আর মুড়ি। এসব শুকনো খাবার বাচ্চারা আর খেতে চায় না। চিড়ি মুড়ির বদলে কিছু চাল ডাল দিলে জীবনটা রক্ষা হতো।

 


সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১১ উপজেলা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। চলতি বন্যায় অতিথের সকল রেকর্ড ছাড়িয়েছে। জেলার ২৫ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছিলেন। এক সপ্তাহ পরও বেশিভাগ বসতঘরে এখন পানি রয়ে গেছে। ঘর-বাড়িতে পানি উঠায় জেলার ৪৫৬ আশ্রয় কেন্দ্রে ১ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষ আশ্রয় নেন। যারা দুর্গম এলাকায় পানিতে আটকা ছিলেন সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ডসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তাদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেন। এদিকে আশ্রয় কেন্দ্র ও বন্যা কবলিত এলাকায় তীব্র খাবার, বিশুদ্ধ পানি, আশবাপত্র, ঘর মেরামতের  সংকট দেখা দিয়েছে। খাবার সংকটের পাশাপাশি অনেকেই ডায়েরিয়াসহ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা কবলিত এলাকায় পর্যাপ্ত পরিমান ত্রাণ দেয়ার কথা বলা হলেও বেসরকারী এবং বিভিন্ন সংঘটনের ত্রান ও সহযোগিতা বেশী পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বানভাসি।

 


সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বন্যায় মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে, বন্যাদূর্গতরা কেউ না খেয়ে নেই। প্রতিদিন ৪৪ হাজার মানুষকে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৬৭৫ টন চাল ও ১২ হাজার বস্তা শুকনো খাবার এবং নগদ ৮০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/এমএআর/ইআ