টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয় সিলেট জেলায়। বন্যা কবলিত হয়ে পানিতে নিমজ্জিত হয় পুরো কোম্পানীগঞ্জ উপজলাও। ইতিহাস সৃষ্ট এই বন্যায় মানুষ হারিয়েছে তাদের ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু। সেই সাথে এই বন্যায় প্রাণ কেড়ে নিয়েছে কত মানুষের সেই সঠিক হিসাব হয়তো পাওয়া যাবে না। এমন পরিস্থিতিতে চারিদিকে তৈ তৈ করা পানির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটুকরো দ্বীপ হিসেবে পানির উপরে ছিল ভোলাগঞ্জ গ্রাম।

 


চারিদিকে যখন মানুষের বাঁচার জন্য আকুতি ঠিক তখনই ভোলাগঞ্জ গ্রামবাসী তাদের মানবতার হাত বাড়িয়ে দেয়। আশ্রয় দেন প্রায় ৩০ হাজার মানুষের। তাদের খাবার, কাপড়, চিকিৎসা, জেনারেটরের মধ্যেমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সহ সব ধরনের সেবা দিয়েছেন। এ ছাড়াও মৃত ব্যক্তিদের তাদের কবরস্থানে দাফনেরও ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।

 

১৬ জুন রাতে এক ভিডিও বার্তায় ভোলাগঞ্জ আরাবিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার সভাপতি শাহাব উদ্দিন গ্রামবাসীর পক্ষে ঘোষণা দেন বন্যা কবলিত মানুষদের আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ভোলাগঞ্জ গ্রামবাসী তাদের পাশে আছে। যে কেউ চাইলে আশ্রয় নিতে পারেন। এর পর থেকে মানুষ আশ্রয় নিতে থাকে ভোলাগঞ্জ গ্রামে। এরই মধ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন আসতে থাকে মানুষজন আটকে আছে, নৌকার জন্য আসতে পারতেছে না। ঠিক এই সময়ে ভোলাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি আবুল বাশারের নির্দেশে ভোলাগঞ্জ ইসলামী সমাজকল্যাণ সংস্থার সদস্য এখলাছুর রহমান, নাসির উদ্দিন, হাজী জসিম উদ্দিন, বুরহান উদ্দিন, ওবায়েদ, জাকির, শাহিন আহমদ, নুর উদ্দিন, মজফর, নাজিম, আশিক, মাসুমসহ প্রায় ২০ জন সদস্য ৫ টি ইঞ্জিন চালিত নৌকা দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন জায়গা আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করে ভোলাগঞ্জ গ্রামে নিয়ে আসেন। ১৬ তারিখের পর থেকে প্রায় ৩০ হাজার বন্যা কবলিত মানুষকে আশ্রয় দেন ভোলাগঞ্জ গ্রামবাসী।

বন্যার্তদের জন্য ভোলাগঞ্জ গ্রামে ৪টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়। তার মধ্যে ভোলাগঞ্জ আরাবিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ১ হাজার, ভোলাগঞ্জ কিন্ডারগার্ডেনে ৭'শ, ভোলাগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫'শ ও ভোলাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যায়ে ৫'শ মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এদের খাবার থেকে শুরু করে কাপড়, চিকিৎসা সহ সব কিছু করা হয় গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে। টানা ৬ দিন ভোলাগঞ্জ আরাবিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসায় বাবুর্চি দিয়ে রান্না করে আশ্রয় কেন্দ্র গুলোর জন্য সকালের নাস্থা ও ২ বেলা ভাতের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতি ওয়াক্তে প্রায় ৩ হাজার মানুষের খাবার রান্না করা হতো। বন্যার্ত মানুষের খাবারের জন্য মাদ্রাসার সভাপতি ছাড়াও অর্থ জোগান দেন ভোলাগঞ্জ চুনাপাথর আমদানি কারক গ্রুপের কোষাধ্যক্ষ আব্দুস সালাম বাবুল, ভোলাগঞ্জ জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক বশির আহমদ, ভোলাগঞ্জ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফরহাদ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হক, ব্যবসায়ী আক্তারুজ্জামান নোমান, কাওসার আহমদ, সাজ্জাদ হোসেন দুদু, ইসমাইল হানিয়া। এ ছাড়াও আশ্রয় কেন্দ্রে আসা মানুষদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা করেন ব্যবসায়ী শাহ আলম ভূইয়া। তিনি ভোলাগঞ্জ বাজারে চিকিৎসক সেতু ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী মোঃ রাজু ও ভোলাগঞ্জ ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী মোঃ রনি (ডিএমএস, আরএমপি) এর মাধ্যমে ২৪ ঘন্টা চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যান। আশ্রয় কেন্দ্রে আসা মানুষদের পানি ও বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো।

 

এসব মানুষের খাবার থেকে শুরু করে চিকিৎসা সহ সকল বিষয়ে সার্বক্ষণিক তদারকিতে ছিলেন ভোলাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি আবুল বাশার ও ভোলাগঞ্জ ইসলামি সমাজ কল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এখলাছুর রহমানের নেতৃত্বে ভোলাগঞ্জ ইসলামি সমাজ কল্যাণ সংস্থার একটি টিম এবং হাফিজ মাওলানা কামরুল হাসান জুলহাসের নেতৃত্বে মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদেও সমন্বয়ে আরো একটি টিম।

ভোলাগঞ্জ আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে মানুষের আশ্রয় ছাড়াও গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ গৃহপালিত পশুদেরও আশ্রয় দেওয়া হয়। আশ্রয় কেন্দ্র ছাড়া গ্রামের প্রতিটি বাড়ি ও ঘরে বন্যা কবলিত মানুষদের আশ্রয় দেন ভোলাগঞ্জের বাসিন্দারা। পুরো উপজেলার মধ্যে ভোলাগঞ্জ যেন এক আশ্রয়ের গ্রাম হিসেবে পরিনত হয়েছিল। প্রায় ৩০ হাজার আশ্রিত মানুষ ভোলাগঞ্জ গ্রামে থাকলেও ৬ দিনে কোন সরকারি ত্রাণ তাদের কাছে আসেনি।

 

ভোলাগঞ্জে আশ্রয় কেন্দ্র ছাড়াও বন্যার সময় মারা যাওয়া অন্য এলাকার ২ জন ব্যাক্তিকে তাদের কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ভোলাগঞ্জ যুব সমাজ ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে এখন পযন্ত বন্যা কবলিত কোম্পানীগঞ্জের নিম্না লের মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে চাল, ডাল, তেল ও রান্না করা খাবারসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।

 

ভোলাগঞ্জ আরাবিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার সভাপতি ও ভোলাগঞ্জ চুনাপাথর আমদানি কারক গ্রুপের সভাপতি শাহাব উদ্দিন জানান, ১৬ জুন মানুষের আর্তনাদ দেখে আমরা ভোলাগঞ্জ গ্রামবাসী চুপ থাকতে পারিনি। মানুষ মানুষের জন্য। তাই গ্রামের সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্যা কবলিত মানুষদের আশ্রয় ও তাদের খাবারের ব্যবস্থা সহ সব ধরনের ব্যবস্থা করে দেন।

 

তিনি আরো বলেন, বড় ভাই আবুল বাশারের উৎসাহে আমি একটি ভিডিও বার্তা দেই। এর পর থেকেই মানুষ আমাদের আশ্রয় কেন্দ্র ও গ্রামে আশ্রয় নিতে আসেন। ভোলাগঞ্জে এমন কোন ঘর নাই যে ঘরে মানুষ আশ্রয় নেয় নি। আমার গ্রামের যারাই এই কাজে এগিয়ে এসেছেন সকলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/এজে/এসডি-৪২