খলিলুর রহমান, ঢাকা অফিস:: স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছে সিলেট। মধ্য জুনে আঘাত হানা সেই বন্যা এখনও বিদায় নেয়নি। দীর্ঘস্থায়ী এই বন্যায় ক্ষতিও হয় বেশি। সেজন্য এ ধরনের পরিস্থিতির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। একইসাথে নদীতে নাব্যতার অভাব এবং অবৈধ দখল আলোচনায় আসছে। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই ব্যাপক বৃষ্টিপাত হওয়ায় এবার বন্যা ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল।


সিলেট থেকে নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারীদের অন্যতম শাহ শাহেদা বেলা বলেন, ভারতের চেরাপুঞ্জী এলাকার অতিবৃষ্টির পানি এসে সিলেট অঞ্চলে অল্প সময়েই বন্যা ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছিল। অতিমাত্রার বৃষ্টির পানি ধারণ করার ক্ষমতা সেখানে হাওর এবং নদীগুলোর নেই। আর সেজন্য তিনি হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং নদী দখল বা খনন না করা-এসব বিষয়কে কারণ হিসাবে দেখেন।


তিনি জানান, সিলেট অঞ্চলে নদীগুলো দীর্ঘদিন খনন করা হয়নি। হাওরগুলোতে ফসল রক্ষার নামে প্রতিবছর অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া হাওর, জলাশয় এবং নদীর অবৈধ দখল চলছে। সুতরাং এগুলোই আমাদের মুল সমস্যা বলেনও জানান তিনি। 


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের বন্যায় এখন অবধি সিলেট জেলায় ৪১ হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির সংখ্যা হাজার খানেক। বাকিগুলো জেলার বিভিন্ন উপজেলার।


সিলেট জেলা প্রশাসনের সহকারি কমিশনার আহসানুল আলম জানান, এবারের বন্যায় সিলেট সিটি করপোরেশনসহ জেলার ১৩টি উপজেলা ও ৫টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় জেলার প্রায় ৩০ লাখ লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েন। জেলায় ৬১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৪ জন লোক আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।


তিনি জানান, ভয়াবহ বন্যায় জেলার ৪ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৩টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪০ হাজার ৯১টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এ তালিকায় সিটি করপোরেশনের হিসেব নেই।
এই কর্মকর্তা আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা দুযোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠির ঘরবাড়ি নির্মাণ বা মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের আবেদন জানানো হয়েছে।


সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী বলেন, ‘নগরে হাজারখানেক ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা আমরা প্রস্তুত করছি। এরপর তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হবে।’


শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোস্তাক আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই সিলেট সুনামগঞ্জে বন্যার ব্যাপকতা বাড়ছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে ব্যাপকভাবে গাছ এবং পাহাড় কাটা হচ্ছে। পাহাড়গুলো কিন্তু পানি শোষণ করতে পারতো। পাহাড় কাটার কারণে পানিশোষণ করতে পারছে না।


এদিকে, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা জানায়, মেঘনা অববাহিকার ১৬টি আন্তঃদেশীয় নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবাহমান। সেসব নদীর পানি ও পলি ব্যবহারে নেই কোনো চুক্তি। ফলে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছে ভারত। উজার করছে বন। বাংলাদেশ অংশের নদী অনেকটা সরু হয়ে গেছে। নেই পর্যাপ্ত প্লাবন ভূমিও। দখল-দূষণ আর অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে বন্যার এই ভয়াবহ রূপ।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ কেআরএস