পবিত্র ঈদুল আযহা আগামীকাল রোববার। সিলেট অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্নস্থানে এ বছর স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা ও ৩য় বারের মতো করোনাভাইরাস সংক্রমণে সতর্কতামূলক ব্যবস্থাপনার মধ্যেই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপন করবেন। আত্মত্যাগের নিদর্শন হালাল পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে ঈদুল আযহার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।

 


মুসলমানদের দু’টি প্রধান ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে ঈদুল আযহা একাধিক কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। তার মধ্যে অন্যতম হলো পশু কোরবানির মাধ্যমে মানুষের মনের পশুত্ব জবাই করা এবং সামর্থ্যবানদের পবিত্র হজ পালন করা।

 

 
করোনা মোকাবিলায় ও সংক্রমণ বিস্তার রোধে ঈদুল ফিতরের মতো এই ঈদেও সরকারের নির্দেশনায় শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রত্যেককে নিজ বাসা থেকে অযু করে ঈদগাহে এবং মসজিদে আসতে বলা হয়েছে। তাছাড়া কোভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে, ঈদগাহ ও মসজিদের অযুখানায় সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।


 
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘ঈদের জামাতে অংশ নেয়ার সময় প্রত্যেককে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে এবং কেউ ঈদগাহ বা মসজিদে রাখা টুপি বা জায়নামাজ ব্যবহার করতে পারবেন না। ঈদের নামাজ আদায়ের সময় সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে এবং অবশ্যই এক সারি খালি রেখে নামাজের জন্য দাঁড়াতে হবে।’


বাংলাদেশে গতকাল শুক্রবার ৮ জিলহজ্ব হলেও সৌদি আরবে ছিলো ৯ জিলহজ্ব। এদিন হজের দ্বিতীয় দিন হাজীরা মিনা থেকে দক্ষিণ পূর্বে আরাফাতের ময়দানে এসে হাজির হন। আরাফাতের ময়দানে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করেন হাজীরা। এই সময় তারা মসজিদে নামিরায় হজের খুতবাসহ একত্রে জোহর ও আসর নামাজ আদায় করেন।

আরাফাতের ময়দানে সারাদিন অবস্থানের পর সন্ধ্যায় হাজীরা মিনা ও আরাফাতের মধ্যবর্তী মুজদালিফায় গিয়ে রাত্রিযাপন করবেন। মুজদালিফায় একত্রে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করে সেখান থেকে মিনায় শয়তানকে প্রতীকি পাথর নিক্ষেপের জন্য নুড়িপাথর সংগ্রহ করবেন তারা। সারারাত মুজদালিফায় অবস্থানের পর শনিবার মিনায় গিয়ে হাজীরা তিন জামরাতে শয়তানকে প্রতীকি পাথর নিক্ষেপ, কোরবানি ও চুল কাটার মধ্য দিয়ে ইহরাম থেকে মুক্ত হবেন। এর আগে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতায় বৃহস্পতিবার মক্কা থেকে পূর্বে মিনায় উপস্থিত হন হাজীরা। সেখানে তারা সারাদিন ও রাত ইবাদতের মধ্যে কাটান।

 


বতর্মান করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৭ জুলাই জারীকৃত বিজ্ঞপ্তি অনুসরণপূর্বক যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে পবিত্র ঈদুল আযহার নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদের খতিব-ইমাম, ধর্মপ্রাণ মুসল্লী ও সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করা হয়েছে।

 


যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যদিয়ে সারাদেশে মুসলিম সম্প্রদায় ঈদুল আযহা উদযাপন করবে। মহান আল্লাহর অপার অনুগ্রহ লাভের আশায় ঈদুল আযহার জামাত শেষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সামর্থ অনুযায়ী পশু কোরবানি করবেন।

 


সারাদেশে বিভাগ, জেলা, উপজেলা, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ এবং সরকারি সংস্থাসমূহের প্রধানগণ জাতীয় কর্মসূচীর আলোকে নিজ নিজ কর্মসূচি প্রণয়ন করে ঈদ উদযাপন করবেন।

 


এছাড়াও বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি গণমাধ্যমসমূহ যথাযোগ্য গুরুত্ব সহকারে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার ও সংবাদপত্রসমূহে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করবে। ঈদ উদযাপন উপলক্ষে দেশের সকল হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু সদন, বৃদ্ধ নিবাস, মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনসমূহে যথাযথভাবে পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপন করবে। এ উপলক্ষে সারাদেশে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রক্ষার্থে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

 


কোরবানিকৃত পশুর রক্ত বা বর্জ্য পদার্থ দ্বারা যাতে পরিবেশ দুর্গন্ধময় না হয় সে বিষয়ে সকল প্রকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সিলেট সিটি কর্পোরেশনসহ সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। ঈদুল আযহার পূর্ববর্তী জুমার খুৎবায় এ বিষয়ে মুসলিমদের সচেতন করা হয়েছে।

 


উল্লেখ্য, প্রায় ৪ হাজার বছর আগে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভের জন্য হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিজ পুত্র হযরত ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন। কিন্তু পরম করুণাময়ের অপার কুদরতে হযরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। হযরত ইব্র্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের মহিমার কথা স্মরণ করে বিশ্বব্যাপি মুসলিম সম্প্রদায় জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখে আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ লাভের আশায় পশু কোরবানি করে থাকেন। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য আল্লাহ কোরবানি ফরজ করে দিয়েছেন। এজন্য ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কোরবানি করাই এ দিনের উত্তম ইবাদত। সেই ত্যাগ ও আনুগত্যের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সারাদেশের মুসলিম সম্প্রদায় রোববার দিনের শুরুতেই মসজিদে সমবেত হবেন এবং ঈদুল আজহার দু’রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করবেন। নামাজের খুতবায় খতিব তুলে ধরবেন কোরবানির তাৎপর্য। করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদের এসব জামাত অনুষ্ঠিত হবে। নামাজ শেষে মুসল্লিদের অনেকেই যাবেন কবরস্থানে। চিরবিদায় নেওয়া স্বজনদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সজল চোখে এই আনন্দের দিনে তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে আল্লাহর দরবারে আকুতি জানাবেন। এবার স্মরণকালের বন্যা ও করোনা বাড়তে থাকায় দুর্যোগময় এ পরিস্থিতিতে ভিন্ন পরিবেশে কোরবানির ঈদ হওয়ায় অন্যান্য বারের চেয়ে পশু কোরবানি কিছুটা কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 


জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আজহা উদযাপিত হলেও পরের দুই দিনও পশু কোরবানি করার বিধান রয়েছে। কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির সমুদয় অর্থ এবং কোরবানি দেওয়া পশুর মাংসের তিন ভাগের এক ভাগ গরীব ও মিসকিনদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হবে। মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় এই উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ দেশবাসীকে ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ঈদুল আযহা উপলক্ষে আজ শনিবার থেকে সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে।

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ইআ