সিলেটে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এখনো জেলার বিভিন্ন উপজেলায় লাখো মানুষ পানিবন্দি। খাল ও হাওর ভরপুর থাকায় নিম্নাঞ্চল থেকে ধীরগতিতে নামছে পানি। ফলে এখনো অনেক এলাকার বাড়িঘর, হাট-বাজার ও রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে আছে।
পানি নিষ্কাশনে ধীরগতি দেখা দেওয়ায় ওইসব এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া অনেক এলাকা থেকে পানি নামলেও বন্যার তোড়ে ভেসে গেছে বসতঘর। ফলে গৃহহীনরা ফিরতে পারছেন না বাড়ি। সরকারি হিসাবমতে, রবিবার পর্যন্ত সিলেটে ৫ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন।
গত ১৫ জুন সিলেটজুড়ে দ্বিতীয় দফা বন্যা দেখা দেয়। পুরো জেলায় এমন ভয়াবহ বন্যা এর আগে কেউ দেখেনি। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বন্যায় প্রায় ৫ লাখ পরিবারের ৩০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। জেলার প্রায় ৬০ ভাগ এলাকা ছিল বন্যাকবলিত। এক মাসে জেলার অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে। তবে এখনো নিম্নাঞ্চলের মানুষকে বন্যার সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। পানিবন্দি অবস্থায় কাটাতে হচ্ছে বিভিন্ন এলাকার মানুষকে।
জানা গেছে, সিলেট সদর, বিশ্বনাথ ও জৈন্তাপুর উপজেলা প্রায় বন্যামুক্ত অবস্থায় আছে। সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত দক্ষিণ সুরমার পশ্চিম লাউয়াই, গাঙ্গু, কাজিরখলা, মুছাগাঁও ও গালিমপুরের কিছু অংশ এখনো পানিতে তলিয়ে রয়েছে। সিটি করপোরেশন লাগোয়া দক্ষিণ সুরমা উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো পানিবন্দি রয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মোগলাবাজার, দাউদপুর, জালালপুর ইউনিয়ন এবং সিলাম ও মোল্লারগাঁও ইউনিয়নের আংশিক এখনো বন্যাকবলিত অবস্থায় রয়েছে। গতকাল পর্যন্ত উপজেলার ৩৩টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১ হাজার ৬৮০ জন বন্যার্ত অবস্থান করছিলেন।
সিলেটে এখনো বন্যায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন বালাগঞ্জ উপজেলার মানুষ। এ উপজেলার পূর্ব ও পশ্চিম গৌরীপুর, দেওয়ানবাজার, পূর্ব পৈলনপুর, বোয়ালজুর ও সদর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। কুশিয়ারায় ধীরগতিতে পানি কমায় বন্যা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না বালাগঞ্জ উপজেলার মানুষ। প্লাবিত এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। জেলার মধ্যে বালাগঞ্জে সর্বোচ্চ মানুষ এখনো আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছেন। ৫৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৪ হাজার ৫৬ জন মানুষ অবস্থান করছেন। ওসমানীনগর উপজেলার নিম্নাঞ্চলও বন্যামুক্ত হয়নি।
পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে সাদিপুর ইউনিয়নের খসরুপুর, লামাতাজপুর ও উমরপুর ইউনিয়নের মিঠাভরাং ও মজলিসপুর এলাকা। উপজেলার ৬১টি আশ্রয় কেন্দ্রে এখনো অবস্থান করছেন ২ হাজার ১৫০ জন। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় মারাত্মক ভোগান্তিতে রয়েছেন।
কুশিয়ারা তীরবর্তী এ উপজেলার পশ্চিম মল্লিকপুর, ইলাশপুরের একাংশ, সালেহপুরের একাংশ, কুরকুছিরপাড়ের মানুষ এখনো পানিবন্দি। বন্যায় তলিয়ে রয়েছে মানিককোনা-মল্লিকপুর-ইলাশপুর সড়ক। উপজেলার ১৭টি আশ্রয় কেন্দ্রে এখনো অবস্থান করছেন ১ হাজার ১১৪ জন বন্যার্ত।
গোয়াইনঘাট উপজেলার নন্দিরগাঁও ইউনিয়নের কুচারপাড়, দাড়িকান্দি, দাড়িরপাড়, বাইমারপাড়, চালতাবাড়ি, হিয়ালা হাওর, লক্ষ্মীহাওর, তোয়াকুল ইউনিয়নের লক্ষ্মীনগর, বেউয়ারকান্দি, পূর্ব পেকেরখাল, ঘোড়ামারা, জামলাকান্দি, ডৌবাড়ি ইউনিয়নের সাতকুড়িকান্দি, ডাকাতিকান্দি, নিহাইল হাওর, লেঙ্গুড়া ইউনিয়নের সিকিংবাড়ি, লেঙ্গুড়াহাওর, পশ্চিম আলীরগাঁওর তিতকুল্লি, নাইলতা হাওর এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো রয়েছেন ভোগান্তিতে। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ইছাকলস ও উত্তর রনিখাই ইউনিয়নের একাংশের লোকজনও রয়েছেন বন্যার ভোগান্তিতে।
জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলার নিম্নাঞ্চল থেকে এখনো বন্যার পানি নামেনি। জকিগঞ্জের কাজলসার ইউনিয়নের জামালপুর, ডেমারগ্রাম, খলাছড়া ইউনিয়নের ষাটষোলা ও বীরশ্রীর যশা গ্রামের মানুষ এখনো পানিবন্দি রয়েছেন। কানাইঘাটের দিঘিরপাড় ইউনিয়নের মাটিজোরা এবং রাজাগঞ্জের কাঁঠালবাড়ী ও আটলারপাড় এলাকা এখনো বন্যাকবলিত। বিয়ানীবাজার উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো বন্যাকবলিত। কুড়ারবাজার, চারখাই, দুবাগ ও শেওলা ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ এখনো পানিবন্দি। গোলাপগঞ্জ উপজেলার কুশিয়ারা তীরবর্তী বুধবারী বাজার, শরীফগঞ্জ, বাদেপাশা ইউনিয়নের বেশির ভাগ এলাকা এবং আমুড়া, ঢাকাদক্ষিণ ও ভাদেশ্বর ইউনিয়নের আংশিক এলাকা থেকে এখনো পানি নামেনি।
এদিকে যেসব এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমেছে সেসব এলাকার গৃহহীনরা এখনো বাড়ি ফিরতে পারেননি। বন্যায় ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তারা ঘর পুনর্নির্মাণ করতে না পারায় আশ্রয় কেন্দ্র ও আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে অবস্থান করছেন।
সিলেটভিউ২৪ডটকম / শাদিআচৌ /এসডি-২১




