মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে সিলেট নগরের বেশির ভাগ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। শনিবার (১৬ জুলাই) হওয়া ভারী বৃষ্টিতে বাসা-বাড়ি ও দোকানপাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ঢুকে পড়ে পানি। ফলে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছিলেন সিলেট নগরবাসী। মাত্র ১ ঘণ্টার বৃষ্টিতে এমন জলাবদ্ধতা নিয়ে নগরবাসী দোষারোপ করেন সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে। নগরবাসীর চাপ ও সমালোচনার মুখে পড়ে সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সংবাদ সম্মেলন করেছেন।
মঙ্গলবার (১৯ জুলাই) সংবাদ সম্মেলনে মেয়র আরিফ জলাবদ্ধতার কারণ ও উত্তরণ নিয়ে কথা বলেন। চার কারণে নগরীতে ভয়াবহ জলাবাদ্ধতা হয়েছে বলে জানান মেয়র।
মেয়রের ভাষ্য অনুযায়ী জলাবদ্ধতার কারণগুলো হলো- অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, নগরবাসীর যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা, ঢলে টিলা ধসে ছড়া ও ড্রেন ভরাট এবং সময়মতো ড্রেন-ছড়া পরিষ্কার না করা।
আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘গত শনিবার দিনে অস্বাভাবিক তাপদাহের পর রাতে অল্প সময়ে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টির কারণে আকস্মিক দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে নগরবাসীকে। সেই দুর্ভোগের শিকার আমি নিজেও। যদিও আমার বাসা নগরের মধ্যভাগে উঁচু এলাকায়। শনিবার রাতে ১১টা ২ মিনিট থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ৫৮ মিনিটে ৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। ওইদিন মোট ৬ ঘণ্টায় ১৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। যা সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে কম সময়ে বেশি বৃষ্টির রেকর্ড। এটিকে অতিপ্রাকৃতিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, নগরের অনেকেই রয়েছেন যারা বাসা-বাড়ির যত আবর্জনা রয়েছে সেগুলো ড্রেনে ফেলে দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ের বন্যার কারণে অনেকেই বাসা থেকে বের না হয়ে রাস্তায় বা উঠানে ময়লা আবর্জনা ফেলে দিয়ে ড্রেন ভরে দিচ্ছেন। ফলে পানি নিষ্কাশন বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া এবারের বন্যায় দলদলি নগরের কয়েকটি টিলা ধ্বসে গিয়ে মাটি ছড়ায় পরে গেছে। ফলে পলি এসে আমাদের ড্রেন ভরে গেছে। আমাদের যে ছড়া-খাল বা ড্রেনের গভীরতা ছিল, সেগুলো ময়লা আবর্জনা ও পলিতে ভরে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে আমরা এগুলোতে কাজ করতে পারিনি। কারণ, বন্যা ও বৃষ্টি ছিল।
গেল শনিবারের বৃষ্টিপাতে কথা উল্লেখ করে মেয়র আরিফ বলেন, ‘আমাদের পরিচ্ছনতাকর্মীরা রাত ১২টায় কাজ করেন। কিন্তু শনিবার যখন বৃষ্টিপাত শুরু হয় তখন কিন্তু আমাদের পরিচ্ছনতাকর্মীরা কাজ শুরু করেননি। ফলে রাস্তার মধ্যে থাকা পলিথিন ও ময়লা আবর্জনা ড্রেনে গিয়ে আটকা পরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। পানি তখন কাটতে (নামতে) পারেনি। একদিকে বেশি বৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে ব্লকের কারণে পানি ড্রেন দিয়ে নামতে পারেনি। জলাবদ্ধতা হওয়ার এটা অন্যতম কারণ।’
আরিফ বলেন, ‘জলাবদ্ধতার ক্ষেত্রে আমাদের কিছু সমস্যা আছে, এ ক্ষেত্রে আমরা ব্যর্থ। এটা আমার স্বীকার করতে কোনো অসুবিধা নাই। এবারে বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে গেছে। আমাদের ধারণা ছিল, বর্ষার সময় বৃষ্টি শুরু হবে। বঙ্গবীর রোডে যে জলাবদ্ধতা, তা আমাদের উন্নয়নকাজ চলাকালীন আগাম বৃষ্টি চলে আসায় সৃষ্টি হয়েছে। ’
আরিফ আরও বলেন, ‘বন্যার পরপরই কোরবানির ঈদ চলে এলো। ফলে কোরবানির বর্জ্য অপসারণে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আমাদের দুর্ভাগ্য, যদি পয়েন্টে পয়েন্টে বা আমাদের ড্রেনগুলোতে যে ময়লা জমছিল, সেগুলো যদি আমরা পরিষ্কার করে ফেলতাম, তাহলে শহরের অনেক জায়গায় পানি ওঠতো না বলে বিশ্বাস। আমরা আসলে জানতাম না এতো বেশি বৃষ্টি হবে, এটা চিন্তা করিনি।’
তিনি বলেন, নদী ও ছড়ার পানির লেভেল সমান থাকায় নদীতে পানি উপচে নামছে না। ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। তবে আমরা শহর বাঁধ ও সুইচ গেইট নির্মাণে প্রকল্প করার চিন্তা করেছি। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সেটি প্রেরণ করা হয়েছে। তারা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই বলছেন আমরা পরিকল্পনা ছাড়া কাজ করি। বাস্তবিক অর্থে আমরা যখন পরিকল্পনা করি সেটি পরিকল্পনা কমিশনের পাঠাই। কমিশন থেকে মাস্টার প্ল্যান অনুমোদন হলে কাজ শুরু হয়। যদি কারো কাছে আমাদের কাজের পরিকল্পনা ‘অপরিকল্পিত’ মনে হয় ; সেটা আমাদের বলতে পারেন। যদি তাদের ত্রুটি যৌক্তিক মনে হয় আমরা তা সাদরে গ্রহণ করবো।
আগামীতে জলাবদ্ধতা রোধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে মেয়র বলেন, ‘পরিস্থিতি পর্যালোচনায় আমরা তাৎক্ষণিক সচেষ্ট হই। আবহাওয়া অফিসের আগাম সতর্কবার্তায় এই অতিপ্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের সাথে মতবিনিময় করেছি, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েছি। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এমন ঘটনা আরও ঘটতে পারে, সেদিক বিবেচনায় আমরা সিসিকে জরুরি সভার আয়োজন করেছি।
তিনি সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে থাকা পাঠানটুলা থেকে মদিনা মার্কেটের রাস্তা, সোবাহানিঘাটের রাস্তা, আম্বরখানা থেকে বিমানবন্দর রাস্তার কথা উল্লেখ করে বলেন, এ সড়কগুলো সওজের। তাদেরকে আমরা বলে ড্রেনগুলো ঠিক করে দিতে। কিন্তু তারা গুরুত্ব দেননা। আমাদেরও দেয় না। অনেক সময় আমাদের কিছু করার থাকে না। তবুও জনসাধারণের কথা চিন্তা করে বিভিন্ন সময় আমরা কাজ করি। তবে তারা ড্রেনেজ ব্যবস্থা করতে না পারায় জলাবদ্ধতা আরও বৃদ্ধি পায়। নগরবাসীর স্বার্থে আমি আপনি সকল একে অন্যকে সহযোগিতা করা উচিত।
তিনি বলেন- দিন কিংবা রাত, যেকোনো সময় অতিবৃষ্টি শুরু হলে আমাদের ৮টি স্ট্রাইকিং টিম পরিচ্ছন্নতা কাজের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। আমিসহ সকল কাউন্সিলর, কর্মকর্তা, কর্মচারীগণ মাঠে থাকবো।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/মুন্না/ ডি.আর/পিডি




