ইমন (ছদ্মনাম)। বয়স ১১ বছর। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক চোখ বুলিয়ে হাতে থাকা পলিথিন থেকে নাক আর মুখ দিয়ে বাতাস টেনে এনে নেশা গ্রহণ করার চেষ্টা করছে। কাছে যেতেই দেখা গেল শিশুটির মাকে একি পদ্ধতিতে নেশা করতে!
এভাবেই সর্বনাশা মাদকের ছোবলে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে ‘ড্যান্ডি’ নেশায় পথ-শিশুরা আসক্ত। ধীরে ধীরে যাচ্ছে অন্ধকার জীবনে। এসব শিশুদের বেশিরভাগই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান, যাদের বয়স ৭ থেকে ১৮ বছর বয়সের মধ্যে। পৌর শহরের মধ্যবাজারের ব্রিজে থাকা পথ-শিশুদের মধ্যে এই নেশার করার প্রবণতা বেশী। এছাড়া চা স্টলে শিশু শ্রমে নিয়োজিত শিশুরা এই নেশায় আসক্ত।
জানা গেছে, খুব অল্প টাকায় এক ধরনের জুতার গাম কেনে শিশুরা। দিরাই পৌর শহরের প্রায় এলাকাতেই এসব গাম পাওয়া যায়। পলিথিন ব্যাগে আঠাল ওই পদার্থ নিয়ে কিছুক্ষণ ঝাঁকানো হয়। তারপর পলিথিন থেকে নাক বা মুখ দিয়ে বাতাস টেনে নেয়। এই নেশা ‘ড্যান্ডি’ নামে পরিচিত।
সরেজমিন দেখা যায়, পৌরসভার মধ্য-বাজার ব্রিজ সংলগ্ন মজলিশপুর-ঘাগটিয়া সড়কের প্রবেশ পথে ১১ বছরের একটি শিশুকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পলিথিনের ভেতরে গাম রেখে নেশা গ্রহণ করতে দেখা গেছে। জানা গেছে, তারা ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন চালায়। বিভিন্ন মার্কেটের বারান্দায় রাত্রি যাপন করে। অনেকে মহিলাটিকে পাগল বলেও দাবি করেন।
ভিক্ষুক সজিতা বেগম বলেন, নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এই শিশুগুলো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। সেদিন ১২ বছরের ড্যান্ডি নেশাগ্রস্ত একটি কিশোর এক অন্ধ ভিক্ষুকের টাকা নিয়ে চলে যায়। পরে ঐ কিশোরকে আমি পেয়ে তার শরীরে চেক করে গাম পাই, পরে তা আমি ফেলে দেই।
দুই বোন স্যানেটারী এন্ড হার্ডওয়ারের ম্যানেজার রসেন্দ্র তালুকদার বলেন, আমরা কোন শিশু কিশোর, কিশোরীদের কাছে এই আঠা বিক্রি করি না। যখন থেকে আমরা জানতে পেরেছি এই ড্যান্ডি আঠা নেশার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়, তখন থেকে টিউবওয়েল মিস্ত্রি, কাঠ মিস্ত্রি, জুতার কারিগর ছাড়া আর কারও হাতে বিক্রি করেন না বলে জানান তিনি।
দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. প্রশান্ত দাস তালুকদার বলেন, নাক দিয়ে এই অ্যাডহেসিভ-এর ঘ্রাণ নিয়ে নেশা করে। এর ভেতরে একটা মিষ্টি ঘ্রাণ থাকে। এটি প্রথমে জাগায় আনন্দের শিহরন আর অনিয়ন্ত্রিত উন্মাদনা। পরবর্তীতে তা দেহে আনে এক শিথীলতার ভাব। দীর্ঘমেয়াদে এই পদার্থের অপব্যবহারের ফলে এর প্রতি সৃষ্টি হয় চরম আসক্তি যা থেকে অতি সহজে নেশাগ্রস্তরা বেরিয়ে আসতে পারে না। স্বল্পমেয়াদে মাথা ঘোরা, চলাচলে অসংলগ্নতা, কথা জড়িয়ে আসা, হাঁটতে অসুবিধা, অবসাদ, হাত কাঁপা, চোখে ঝাপসা দেখা, ক্ষুধামন্দা, বমি বা বমি ভাব, রক্ত বমি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া সমস্যা দেখা দেয়। এমনকি নেশার অতিমাত্রায় শ্বসন ও হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে কিংবা শ্বাসরোধ বা দুর্ঘটনার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই অ্যাডহেসিভের ঘ্রাণ শরীরের যেসব জায়গায় গিয়ে পৌঁছায়, সেসব জায়গার কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায়। আর কোষ নষ্ট হওয়ার কারণে মস্তিষ্কের কাজে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। এছাড়াও, নাকের ভেতরে ঘা হয়ে যায়। এ ধরনের মাদকে শারীরিক এবং মানসিক উভয় ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়। শিশুরা যেহেতু এটা গ্রহণ করে, ফলে এর প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ।
দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম বলেন, এ ব্যাপারে কেউ আমাদেরকে জানায়নি। তবে এ বিষয়ে খবর পেলেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/হিল্লেল/মাহি




