মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে যেতে হলে সৌদি দূতাবাসে গিয়ে দিতে হবে আঙ্গুলের চাপ। শনিবার (৬ আগস্ট) আঙ্গুলের চাপ দেয়ার শেষ দিন। তাই সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ২০-২৫ জন মহিলা আঙ্গুলের চাপ দিতে আসছেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বাউসা ইউনিয়ন পরিষদে। ফরম ফিলআপের পর অধিকাংশ মহিলা দিয়েছেন আঙ্গুলের চাপও।
এভাবেই অভিনব প্রতারণার ফাঁদে ফেলে সৌদি যেতে আগ্রহী নারীদের কাছ থেকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। শনিবার বিকেলে নবীগঞ্জ উপজেলার বাউসা ইউনিয়ন পরিষদে ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমের ফাঁকে এমন প্রতারণা করতে গিয়ে আটক করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের অপারেটরসহ ৩ জন।
আটককৃতরা হলেন নির্বাচন কমিশনের ভোটার হালনাগাদ প্রজেক্টের কম্পিউটার অপারেটর বানিয়াচং উপজেলার জমশেদ মিয়া (৩০), সুনামগঞ্জ পৌরসভার ইকড়ছই গ্রামের আবু সুফিয়ান (৩৫) ও মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ফাহিম চৌধুরী (২৮)।
ভুক্তভোগীরা জানান, গত ৪ আগস্ট থেকে নবীগঞ্জের বাউসা ইউনিয়নে চলছিল নতুন ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রম। শনিবার (৬ আগস্ট) শেষ দিনে অন্যান্য দিনের ন্যায় নতুন ভোটার হওয়ার ফরমে ঠিকানা জন্মনিবন্ধন নাম্বারসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়ার পর আঙ্গুলের চাপ দিচ্ছিলেন ওই ইউনিয়নের নতুন ভোটাররা।
এ সময় নির্বাচন কমিশনের ভোটার হালনাগাদের প্রজেক্টের কম্পিউটার অপারেটর জমশেদ মিয়া নতুন ভোটার হওয়ার ফরমে ঠিকানা, জন্ম নিবন্ধন নাম্বারের তথ্য অপূরণ রেখেই সুনামগঞ্জের সুলতানা আক্তার সুমীকে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের নতুন ভোটার করার জন্য আঙ্গুলের চাপ গ্রহণ করেন। এরপর নেত্রকোনার ফাহিমা ও বিশ্বনাথের রিমা বেগমের আঙ্গুলের চাপ দেয়ার সময় অপরিচিত দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হলে আবু সুফিয়ান, ফাহিম চৌধুরী ও ৩ মহিলাকে আটক করা হয়।
খবর পেয়ে নবীগঞ্জ থানার ওসি ডালিম আহমেদ, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানসহ একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সন্ধ্যা ৭টার দিকে জমশেদ মিয়া, আবু সুফিয়ান ও ফাহিম চৌধুরীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
সুনামগঞ্জের সুলতানা আক্তার সুমী বলেন, ‘আমি ৩ বছর সৌদি আরবে ছিলাম, এক বছর পূর্বে দেশে এসেছি। আবার আমাকে সৌদি আরব পাঠানোর কথা বলে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আবু সুফিয়ান নামে এক দালাল ১৫ হাজার টাকাসহ পাসপোর্ট নেয়। সুফিয়ান জানায় সৌদি যেতে হলে অ্যাম্বেসিতে আঙ্গুলের চাপ দিতে হবে। তাই সুফিয়ান তার সহযোগী মোফাজ্জল মিয়া ও ফাহিম চৌধুরীর মাধ্যমে সৌদি আরবে যেতে ইচ্ছুক আমিসহ সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ২৫ জন নারীকে আঙ্গুলের চাপ দেয়ার জন্য সৌদি অ্যাম্বেসিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুটি মাইক্রোবাসে করে এখানে নিয়ে এসেছে, আমি আঙ্গুলের চাপও দিয়েছি।’
নেত্রকোনার ফাহিমা আক্তার বলেন, ‘আমি চট্টগ্রামে একটি গার্মেন্টসে চাকরি করি, সৌদি আরবে নেয়ার নাম করে সুফিয়ান নামে এক দালাল আমার কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা নেয়। শনিবার সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য আঙ্গুলের চাপ দেয়ার শেষ দিন এমন কথা বলে চট্টগ্রাম থেকে আমাকে এখানে আঙ্গুলের চাপ দেয়ার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। ঝামেলার জন্য আমি আঙ্গুলের চাপ দেইনি।’
এ ব্যাপারে বাউসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাদিকুর রহমান শিশু মিয়া বলেন, ‘বিভিন্ন জেলা থেকে তথ্য গোপন করে বাউসা ইউনিয়নে ভোটার করার জন্য কয়েকজন দালাল ও নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে আমার ইউনিয়নে নিয়ে আসা হয়। আঙ্গুলের চাপ দেয়ার সময় গ্রাম পুলিশ ও স্থানীয় মানুষ অপরিচিত দেখে তাদেরকে আটক করে।’
নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমের ফাঁকে অন্যান্য উপজেলার নাগরিকদের নবীগঞ্জের বাউসা ইউনিয়নে নাগরিক করার জন্য ভোট তোলা হচ্ছে এমন সংবাদে ঘটনাস্থলে এসে এর প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছি। বাউসা কেন্দ্রের টিম লিডার মতিউর রহমান বাদী হয়ে আটককৃত দালাল চক্র ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের কেউ জড়িত থাকলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যারা আজকে ভোটার হয়েছেন তাদের তথ্য অফলাইনে রয়েছে। উদ্ধার হওয়া ¯িøপ এর সিরিয়াল নাম্বার অনুযায়ী তথ্য যাচাই-বাছাই করে এগুলো বাদ দেয়া হবে। দ্বিতীয়বার ভোটার হওয়ার সুযোগ নেই।’
নবীগঞ্জ থানার (ওসি) ডালিম আহমেদ বলেন, ‘সৌদি যাওয়ার জন্য অ্যাম্বাসিতে আঙ্গুলের চাপ দেয়ার নাম করে একটি চক্র বিভিন্ন জেলা থেকে মহিলাদের বাউসা ইউনিয়ন অফিসের চলমান নতুন ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমে নিয়ে আসে। এখানে নতুন ভোটার হওয়ার ফরমে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রয়োজনীয় তথ্য না দিয়েই অন্যান্য জেলার মহিলাদের আঙ্গুলের চাপ গ্রহণ করা হয়। এ ঘটনায় কম্পিউটার অপারেটরসহ ৩ জন প্রতারককে আটক করা হয়েছে। মামলা দায়ের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/জাকির/আরআই-কে




