দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে চূড়ান্ত বার্তা পেয়েছেন সিলেট মহানগর বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা। তাঁদেরকে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে, আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যে মহানগর শাখার সম্মেলন করতে হবে। যদি তাঁরা ব্যর্থ হন, তাহলে ‘ভিন্ন চিন্তা’ করবে হাইকমান্ড। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্র এমন তথ্য জানিয়েছে সিলেটভিউকে।

সূত্রমতে, প্রায় সাড়ে দশ মাস আগে গঠন করা হয় সিলেট মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি। দীর্ঘ এ সময়ে নিজেদের আওতাধীন ওয়ার্ড কমিটিগুলো গঠনকাজই সম্পন্ন করতে পারেননি দায়িত্বশীল নেতারা। উপরন্তু নিজেদের মধ্যে বিভাদে জড়িয়ে দলীয় কোন্দল বাড়িয়েছেন। এসব কারণে দলটির হাইকমান্ড সিলেট নগর বিএনপির নেতৃত্বের ওপর ক্ষুব্ধ।


এরই প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ এ শাখার নেতৃবৃন্দকে তলব করা হয়েছিল ঢাকায়। গতকাল রোববার বিকালে ঢাকায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সিলেট মহানগর বিএনপির দায়িত্বশীলতের সাথে বৈঠক করেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ভার্চুয়াল মাধ্যমে তিনি বৈঠকে যোগ দেন।

বৈঠকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ডা.এ জেড এম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন মিলন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সিলেট মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকী, সদস্যসচিব মিফতাহ সিদ্দিকী, সাবেক সভাপতি ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নাসিম হোসাইনসহ আহ্বায়ক কমিটির ২৪ জন নেতা বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। বাকিদের মধ্যে ৬ জন অসুস্থতা ও দুজন বিদেশে থাকার কারণে বৈঠকে যোগ দেননি। আরেকজনের জায়গা-জমি সংক্রান্ত মামলার তারিখ ছিল গতকাল।

বৈঠকসূত্র সিলেটভিউকে জানায়, দীর্ঘ দশ মাসেও কেন সম্মেলন আয়োজন সম্ভব হয়নি, তা সিলেট মহানগর বিএনপির নেতাদের কাছে জানতে চান তারেক রহমান। নগর বিএনপির দায়িত্বশীলরা তখন এর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তারা সাম্প্রতিক বন্যার কথা বলেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি তারেক। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দলের নেতাদের মধ্যে বিভাদের বিষয়েও ছিল তাঁর অসন্তোষ।

সূত্রটি আরও জানায়, সিলেট মহানগর বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের সামনে ‘টাইমফ্রেম’ (সময়সূচি) বেঁধে দিয়েছেন তারেক রহমান। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মহানগর বিএনপির আওতাধীন সকল ওয়ার্ডে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন এবং ৩০ অক্টোবরের মধ্যে মহানগর শাখার সম্মেলন আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

বৈঠকে উপস্থিত বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিলেটভিউকে বলেন, ‘তারেক রহমান দলের সাংগঠনিক অবস্থার বিস্তারিত খোঁজখবর নেন। দলের নেতাদের মধ্যে বিরোধের বিষয়ে জানতে চান তিনি। সাংগঠনিক গতিহীনতা ও বিরোধের বিষয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পরে সম্মেলনের জন্য সময়সূচি বেঁধে দিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে সম্মেলন আয়োজনে ব্যর্থ হলে মহানগর শাখার নেতাদের বিষয়ে হাইকমান্ড ভিন্ন চিন্তা করবে বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

জানতে চাইলে সিলেট মহানগর বিএনপির সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নাসিম হোসাইন সিলেটভিউকে বলেন, ‘আমরা ২৪ জন বৈঠকে যোগ দিয়েছিলাম। আমাদের কয়েকজন অসুস্থ, কয়েকজন বিদেশে, ফলে তাঁরা থাকতে পারেননি।’

তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হওয়া বৈঠকে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। মহানগর বিএনপি কী করছে, কিভাবে করছে সব নিয়ে কথা হয়েছে।’

নাসিম হোসাইন সিলেটভিউকে আরও বলেন, ‘কোন স্তরে কোন সময়ের মধ্যে সম্মেলন ও কমিটি গঠন করা হবে, এ জন্য কয়েকটি তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে বৈঠকে। আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন, সে অনুযায়ী কাজ করবে মহানগর বিএনপি।’

অন্যদিকে, নগর বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকী সিলেটভিউকে বলেন, ‘আওতাধীন সকল ওয়ার্ড কমিটি গঠন করে দ্রুত মহানগর শাখার সম্মেলন আয়োজন করতে বলা হয়েছে আমাদেরকে। ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে নির্দেশনা পেয়েছি আমরা।’

বিএনপি নেতারা জানান, ২০১৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে। সম্মেলনে মহানগর বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন নাসিম হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক হন বদরুজ্জামান সেলিম এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হন মিফতাহ সিদ্দিকী। তবে জেলা কিংবা মহানগর, কোনো ইউনিটেরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন হয়নি সেই সম্মেলনে। সম্মেলনের প্রায় ১৪ মাস পর, ২০১৭ সালের ২৬ এপ্রিল সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়।

দুই বছর মেয়াদের জন্য ওই পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন পায়। সেই মেয়াদ পেরিয়ে যায় ২০১৯ সালের এপ্রিলে। এরপর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছিল মহানগর বিএনপি। ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মহানগর বিএনপির ২৯ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। আগের কমিটির সহসভাপতি আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকীকে আহ্বায়ক ও আগের কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকীকে সদস্যসচিব করা হয়। কিন্তু আহ্বায়ক কমিটি ঘিরে শুরুতেই দেখা দেয় বিতর্ক। সেই বিতর্ককে ধামাচাপা দিতে আহ্বায়ক কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করা হয় আরও ৬ নেতাকে। বর্তমানে ৩৫ সদস্যের এ কমিটিতে আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব ছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক ১৩ জন ও সদস্য ২০ জন রয়েছেন।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, মহানগর বিএনপির আওতাধীন ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৭টিতে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাকিগুলোতে কমিটি গঠনের তোড়জোড় চলছে। তবে এ শাখার আহ্বায়ক আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকী ও সদস্যসচিব মিফতাহ সিদ্দিকী পক্ষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় গতি হারায় সাংগঠনিক তৎপরতা। সম্প্রতি দলীয় কর্মসূচি পৃথকভাবে পালন করেছে উভয়পক্ষ। দলের সাংগঠনিক সভায় যোগ দেননি সদস্যসচিব। কেন্দ্রীয় নেতার উপস্থিতিতে হওয়া সমাবেশেও যোগ দেননি তিনি। এর আগে দলের বর্ধিত সভায় তোপের মুখে পড়েন মিফতাহ।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/আরআই-কে