মাসখানেকের ব্যবধানে দুবারের বন্যায় প্লাবিত হওয়ার পর তীব্র তাপদাহে শুকিয়ে গেছে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের গোয়াহরি গ্রামের বিল (বড় বিল)।

 


পানি কমে চাওয়ার ফলে তীব্র গরমে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে ভাসতে শুরু করেছে বিলে। তাই নির্দিস্ট সময়ের পূর্বেই শনিবার (২০ আগস্ট) সকালে গোয়াহরি গ্রামের বিলে (বড় বিল) বিপুল উৎসাহ উদ্দিপনার মধ্যে দিয়ে ঝপ-ঝপা-ঝপ শব্দের তালে তালে অনুষ্ঠিত হয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক ‘পলো বাওয়া’ উৎসব।

 

নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বাংলা বছরের ১লা মাঘ অনুষ্ঠিত হতো ঐতিহ্যবাহী ওই পলো বাওয়া উৎসব।

 

সূর্যের তাপ তীব্র থাকলেও পলো বাওয়া উৎসবে অংশগ্রহনকারী সৌখিন মাছ শিকারীদের পরিমাণে কোন কমতি ছিল না। ‘শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ’ সকলে বয়সের মানুষের অংশগ্রহনে পূর্ব পুরুষদের রেখে যাওয়া শত শত বছরের পুরাণো বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে।

 

এবারের পলো বাওয়া উৎসবে কোন সৌখিন শিকারীদেরকে খালি হাতে ফিরতে হয়নি। গোয়াহরি গ্রামের বিলে (বড় বিল) এবারের পলো বাওয়া উৎসবে ছিলো মাছের হাসি। প্রত্যেক শিকারীই ছোট-বড় একাধিক মাছ হাতে ঘরে ফিরেছেন।

 

বাঁশ-বেতের তৈরী পলো, উড়াল জাল, টেলা ঝাল (প্লেলাইন জাল) হাতে শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আনন্দ চিৎকার দিয়ে একসাথে গ্রামবাসী বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব শুরু করেন। গ্রামবাসীর সাথে অন্য গ্রামে থাকা অনেক আত্মীয়-স্বজনও পলো বাওয়া উৎসবে অংশগ্রহন করেন। প্রায় ২ ঘন্টাব্যাপী চলা পলো বাওয়া উৎসবে সৌকিন মাছ শিকারীদের পলো ও জালে ধরা পড়ে বোয়াল, রুই, কাতলা, শোল, কার্ফু, গজার, ঘনিয়া, বাউশ ও ব্রিগেডসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।

 

পলো বাওয়া উৎসবটি গ্রামবাসীর কাছে একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়। প্রতি বছরের ন্যায় এবার বিয়ে হয়ে যাওয়া গ্রামের মেয়ের পলো বাওয়া উৎসবকে কেন্দ্র করে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। আর বড়রা মাছ শিকারে ব্যস্থ থাকলেও বিলের পারে গিয়ে গ্রামের শিশু ও নারীরা উৎসবের আনন্দ উপভোগ করা থেকে বঞ্চিত হননি, তাদের উপস্থিতিও ছিলো লক্ষণীয়। এছাড়া পলো বাওয়া উৎসব দেখতে ভিন্নগ্রাম থেকে অনেক আত্মীয়-স্বজনও আসেন।

 

গ্রামবাসীরা জানান, পলো বাওয়া উৎসব গোয়াহরি গ্রামের একটি ঐতিহ্য। পূর্বপুরুষের আমল থেকে গ্রামবাসী উৎসাহ উদ্দিপনার সাথে এই উৎসব পালন করে আসছেন। ‘পলো বাওয়া উৎসব’র এক সপ্তাহ পূর্বে পঞ্চায়েতের সভা ডেকে শান্তি-শৃংখলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করে। সভার পরপরই উৎসবের ন্যায় গ্রামের ঘরে ঘরে পলো তৈরী, মেরামত ও সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। পলো বাওয়া উৎসবকে কেন্দ্র করে গোয়াহরি গ্রামে গত কয়েকদিন ধরে গ্রামে বিরাজ করছিল উৎসবের আমেজ। আর টানা প্রায় ১৫ দিন পর্যন্ত চলবে ওই উৎসব। তবে গ্রামবাসীর ঐতিহ্য অনুযায়ী আগামী ১৫ দিন পর ২য় ধাপে আনুষ্ঠানিবভাবে আবারও হবে পলো বাওয়া। আর ওই ১৫ দিনের ভিতরে প্রতি রবিবার ও বৃহস্পতিবার বিলে হাত ও টেলা জাল দিয়ে মাছ শিকার করবেন গ্রামবাসী।

 

পলো বাওয়া উৎসব দেখতে আসা গ্রামের মেয়ে হাজেরা খাতুন বলেন, পলো বাওয়া উৎসব আমাদের গ্রামের ঐতিহ্য। ছোট বেলা থেকেই প্রাণের ওই উৎসব দেখতে বিলে আসি। এবার সবাই মাছ শিকার করতে পেরেছেন দেখে আনন্দ লাগছে। সবার ঘরেই আজ উৎসবের আমেজ থাকবে।

পলো বাওয়া উৎসবে অংশগ্রহনকারী সৌখিন মাছ শিকারী আব্দুল কাহার, ইকবাল হোসাইন, আব্দুর রব, গোলাম শহিদ, মহরম আলী, আমিনুল ইসলাম, মর্তুজ আলী বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও পলো বাওয়া উৎসবে অংশগ্রহন করতে পেরে আনন্দ লাগছে। এবার বিলে মাছের পরিমাণ বেশি থাকায় প্রত্যেকেই একাধিক মাছ শিকার করতে পেরেছেন। আর বিলে মাছে হাসি থাকায় নিজেদের চাহিদাপূরণ শেষে শিকার হওয়া মাছ আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতেও পাঠানো সম্ভব হবে।

 

গোয়াহরি গ্রামের বাসিন্দা ও দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার গোলাম হোসেন বলেন, তীব্র গরমে বিলের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় ও মাছ মরা দেখা দেওয়ার কারণে নির্দিস্ট সময়ের পূর্বেই আজ (শনিবার) শত শত বছরের পুরাণো ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসবের তারিখ নির্ধারণ করেন গ্রামবাসী। আর বিপুল উৎসাহ-উদ্দিপনায় তা সম্পন্ন হয়েছে।

 

গোয়াহরি গ্রামের বাসিন্দা ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী হাসিনুজ্জামান নূরু বলেন, পলো বাওয়া উৎসবটি আমাদের গ্রামের পূর্ব পুুরুষদের রেখে যাওয়া একটি প্রাণের উৎসব। আর ওই উৎসবের সময় গ্রামবাসীর মিলন মেলাও হয়ে যায়। এবার দেশে থাকার কারণে পলো বাওয়া উৎসব দেখতে এসেছি। এটি অনেক আনন্দের একটি উৎসব।

গ্রামের মুরব্বী ছুরত খান বলেন, যুগ যুগ ধরে বাপ-দাদার আমল থেকে পলো বাওয়া উৎসব পালন করে আসছেন গ্রামবাসী। প্রতি বছর পলো বাওয়া উৎসবে গ্রামবাসী একসাথে আনন্দঘণ পরিবেশের মাধ্যমে বিলে মাছ শিকারের কার্যক্রম শুরু করেন এবং দেশীয় প্রজাতির সু-স্বাদু আহরণ করেন।

 

বিশ্বনাথ পৌরসভার সহায়ক কমিটির সদস্য ফজর আলী বলেন, গ্রামবাসীর বিশেষ আমন্ত্রনে গোয়াহরি বিলে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসবে অংশগ্রহন করতে পেরে আনন্দিত হয়েছি। আর মাছ শিকারের পর ওই আনন্দের পরিমাণ কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী উৎসবটি টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/পিবিএ/এসডি-০১