ফাইল ছবি

তমাল ফেরদৌস, মৌলভীবাজার

 


বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন কি কাজের কাজী নাকি তলাবিহীন ঝুড়ি ? এই সংগঠনের নেতারা কি চা শ্রমিকদের ভোটে নির্বাচিত নাকি স্বঘোষিত ? চা শিল্পের চলমান সংকটের চেয়ে সংগঠনটির নের্তৃত্ব সংকট এখন মোটা দাগে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

 

বিশেষ করে চলমান সংকট নিরসনে প্রথম বৈঠকটি পুরোপুরি ভেস্তে যায়। দ্বিতীয় বৈঠকটিও পুরোপুরি সফল হয়নি। চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা যা মানছেন তা সাধারণ শ্রমিকরা মানছেন না।

 

চলমান সংকট নিরসনকল্পে তাঁদের সিদ্ধান্তগুলো বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। সাধারণ শ্রমিকরা তাঁদের নের্তৃত্বের প্রতি কতোটা আস্থাশীল সেই প্রশ্ন এখন সর্বমহলে উত্থাপিত হচ্ছে।

চা শ্রমিক ইউনিয়ন ছাড়াও চা বাগানগুলোতে ভ‍্যালি, পঞ্চায়েত কমিটিসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নের্তৃত্ব ও সরকার বিরোধী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এর মধ‍্যে কখনও সরাসরি কখনও গোপনে একটি রাজনৈতিক সংগঠন  চা শ্রমিকদের দাবি দাওয়া নিয়ে সরব হয়ে উঠে। এই সংগঠনটি তখন পাতি নেতা ও বৃহত্তর সংগঠনগুলোতে স্থান না পাওয়া পাড়াভিত্তিক ছোট নেতাদের কাজে লাগায়। তাঁরা মুখিয়ে থাকে আর সুযোগ পেলেই সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়।

এছাড়াও বাগান মালিক পক্ষের দালালরা মজুরী, রেশনসহ অন‍্যান‍্য সুবিধা নিয়ে বাগান মালিকদের পক্ষে কাজ করে। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় সাধারণ শ্রমিকরা।

মজুরী নিয়ে চা শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন অনেকটা নের্তৃত্ব শুন‍্যতা ও বিভাজন তৈরী করছে নিজেদের মধ‍্যে। বতর্মানে সংকট নিরসনে সব পদক্ষেপই বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে।

 

চা শ্রমিকদের মজুরীর বিষয়টি যদি খেয়াল করা হয় সেক্ষেত্রে দেখা যায়, কোন সরকারের আমলেই বা যেকোন সময়েই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুরী বৃদ্ধি করে বাগান কর্তৃপক্ষ। আর তা মেনে নিয়েই সাধারণ শ্রমিকরা কাজে যোগদান করেছে। কিন্তু চলমান আন্দোলনে সেই ধারাবাহিকতার ব‍্যত‍্যয় ঘটেছে। এক লাফে ১২০ টাকা থেকে ৩শ' টাকা মজুরী বৃদ্ধির দাবি। এটি স্বাধীনতার পর থেকে চা শ্রমিকদের সর্বোচ্চ দাবি। এই দাবিটির পেছনে কি কোন রহস‍্য বা ইন্ধন রয়েছে। সেটিও এখন বিভিন্ন মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ পৃথিবীর কোন প্রতিষ্ঠান বা কর্মক্ষেত্রে এক লাফে এতো মজুরী বৃদ্ধির দাবি বোধহয় এই প্রথম আমরা দেখছি।

গার্মেন্টস বলেন, শিল্প কারখানা বলেন, ব‍্যাংক-বীমা যাই বলেন এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে মজুরী বৃদ্ধি করা হয়। তবে একসাথে নয় ধাপে ধাপে সেটা বৃদ্ধি করা হয়। আর এটি করা হয় মুল মজুরীর সাথে সামঞ্জস্য রেখে।

এখন অনেক মহলেই প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কি চা বাগানগুলো ধ্বংস করতে কোন মহল অন্দরমহল থেকে কলকাঠি নাড়ছে ? কারণ বৃহত্তর এই শিল্প থেকে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমান রাজস্ব পেয়ে থাকে।

বঙ্গবন্ধু যেখানে চা শ্রমিকদের মূল‍্যায়ন করেছেন, তাঁর কন‍্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেখানে সর্বোচ্চ আন্তরিক সেখানে কেউ মানছে কেউ মানছেনা এটা কেন হচ্ছে?

গত ১৪ দিনের আন্দোলনে সাধারণ শ্রমিকরা মজুরী হারিয়েছেন, রেশন হারিয়েছেন সর্বোপরি এনজিওদের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ‍্যে পড়েছেন। এঅবস্থায় সিদ্ধান্তগুলো বারবার না মানার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ শ্রমিকরা।

এখন আরও প্রশ্ন উঠেছে যে, যেসব ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, সদস‍্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, সংসদ সদস‍্য এই চা শ্রমিকদের ভোটে নির্বাচিত হন তাঁদের ভুমিকা কি? এদের মধ‍্যে সরকারবিরোধী একটি চক্র রয়েছে। যাদের আবার সরকারের বিভিন্ন মহলের লোকজনের অর্থনৈতিক লেনদেন, বোতল সম্পর্কসহ মহরম দহরম রয়েছে। তাহলে কি এদের পরোক্ষ মদদে এই সংকট নিরসন হচ্ছেনা। কারাই বা কাদের ইঙ্গিতে চা শ্রমিকরা বাগান ছেড়ে রাজপথে নেমেছে।

 

যদি চা বাগানে সৃষ্ট যেকোন জটিলতা বা সংকট এসব সংগঠনের দ্বারা নিরসন নাহয় তাহলে তলাবিহীন ঝুড়ি সংগঠনগুলোর কাজ কি ? তবে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, এই সংকট যখন কেটে উঠবে তারপর থেকে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সংকট তৈরী করার ক্ষেত্রে কে বা কারা বা কোন সংগঠন অন্দরমহল থেকে কলকাঠি নাড়ছে তা গুরুত্ব সহকারে খুঁজে বের করা। তা নাহলে কিছুদিন পরপরই এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরী হবে এবং প্রধান একটি অর্থকরী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্প একসময় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হবে। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে লক্ষ লক্ষ সাধারণ শ্রমিক। যাদের আর কোথাও কর্মক্ষেত্র নেই, বাসস্থান নেই, এদের দেখভালের জন‍্য ও কেউ নেই।

 

লেখক: সাংবাদিক, সিলেটভিউ২৪ডটকের নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার