বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ড. আকবর আলি খান গত ৮ সেপ্টেম্বর মারা গেছেন। (ইন্না লিল্লাহি…রাজিউন।) বর্ণাঢ্য জীবন বললাম এ জন্য যে, একজন মানুষের ক্ষুদ্র জীবনে আর কী ই অবদান রাখতে পারেন।
৭৮ বছরের জীবনে আকবর আলি খান ছিলেন একজন সিএসপি কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা, দক্ষ প্রশাসক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, কমনওয়েলথ স্কলার, অর্থনীতিবিদ, অর্থনীতি, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও প্রশাসন, সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্যসহ অনেক বিষয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থের লেখক, সুবক্তা, বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা, সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মন্ত্রীর মর্যাদায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্ঠা তথা একজন সত্যিকারের মানুষ।
২০১২ সালের ১০ জানুয়ারী শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাপা-বেন সাস্ট কনভেনশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন। ঐ কনভেনশনের সদস্য সচিব হিসেবে কয়েকবার ফোনে কথা বলা এবং দু’দিন সিলেট অবস্থানে তার সাথে একান্তে কথা বলার অভিজ্ঞতা আমার স্মৃতিতে অম্লান। সে সময় সিলেটের এনডিসি ও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক আমার অনুজ প্রতীম আজিজুল ইসলাম শামীমের সহযোগিতা ভুলার নয়। অনুষ্ঠানের দিন সিলেটে কনকনে শীত ও ঘন কুয়াশা। সকাল ৯ টায় শুরু হলো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। স্টেজে অতিথি ও সভাপতিকে আমন্ত্রন জানানো হলো।
তত্ত্ববধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্ঠা বিচারপতি হাবিবুর রহমান প্রধান অতিথি, আরেক সাবেক উপদেষ্ঠা সুলতানা কামাল সভাপতি, প্রধান উপদেষ্ঠার সাবেক বিশেষ সহকারি চাকমা সার্কেলের রাজা ব্যরিস্টার দেবাশিষ রায় বিশেষ অতিথি, শাবিপ্রবির উপাচার্য প্রফেসর ড. মোঃ সালেহ উদ্দিন, কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. ইলিয়াস উদ্দিন বিশ্বাস ও কনভেনশনের আহবায়ক বাপার বর্তমান সাধারন সম্পাদক শরীফ জামিল ছিলেন মঞ্চে। আকবর আলি খানকে বক্তব্য প্রদানের আমন্ত্রন জানানোর পর উনি ডায়াসে ওঠে আমাকে ইশারায় ডাকলেন। আমি তাঁর কাছে গেলাম। কানে কানে জানতে চাইলেন কত মিনিট উনি বলবেন। আমিও বোকামীসুলভ বলে ফেললাম, ২০/২৫ মিনিট স্যার। মঞ্চে এসে আমার আসনে বসলাম। শরীফ ভাই জানতে চাইলেন আকবর আলি খানের সাথে আমার কী কথা হলো? আমি বললাম উনার বক্তব্যের সময় কতটুকু সেটা জানতে চাইলেন। শরীফ ভাই বললেন, "তুমি কী উত্তর দিয়েছো?" আমি বলেছি ২০/২৫ মিনিট। শরীফ ভাই আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, "তোমার সাহস তো কম না।" উনি আকবর আলি খানের কাছে গিয়ে কানে কানে বললেন, "স্যার, আপনার যত সময় ইচ্ছে কথা বলেন। সময় নিয়ে ভাবতে হবে না। আমরা টাইম মেনেজ করে নিবো।" যাই হোক, উনি ২৪ মিনিট বক্তব্য রাখলেন। প্রতিটি বাক্যই ছিলো অর্থপূর্ন। একেকটি বাক্য যেনো একেকটি ঘটনাকে ইঙ্গিত করে। সামনের বাক্যের সাথে পেছনের বাক্যের সংশ্লেষ। সাবেক মন্ত্রী, এমপি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিপূর্ণ পূরো সেন্ট্রাল অডিটরিয়ামে পিন পতন নিস্তব্ধতা। কমও বললেন না, বেশিও বললেন না। সিলেটের পরিবেশ বিপর্যয় ও করনীয় নিয়েও কথা বলছিলেন। যাই হোক, তাঁর অনেক কথাই আমরা অনুসরন করিনি; মানিনি। অনুসরন করলে বা মানলে দেশ ও জাতি উপকৃত হতো। টকশো বা কোনো অনুষ্ঠানে তাঁর কথা শুনে, "সাহসী বক্তব্য, ন্যায্য কথা, ভালো বলেছেন, সত্যিকারের মানুষ, নীতিবান মানুষ, জ্ঞানী মানুষ" এসব বলাবলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছি বেশির ভাগ সময়। উনার পরার্থপরতার অর্থনীতি, আজব ও জবর আজব অর্থনীতি, বাংলাদেশে বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি, অবাক বাংলাদেশ: বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি, বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এসব গ্রন্থ পড়ে "খুব ভালো লেখেছেন" বলেই দায়িত্ব শেষ করেছি। রাষ্ট্রযন্ত্র ও সমাজ উনার এসব কর্ম থেকে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা নিলে আমাদের দেশ আরো অনেক এগিয়ে যেতো। বার বার আমাদের পেছন ফিরে যেতে হতো না। সর্বোপরি History of Bangladesh, Some Aspects of Peasant Behaviour in Bengal : A Neo-classical Analysis, Discovery of Bangladesh, Gresham's Law Syndrome and Beyond:An Analysis of the Bangladesh Bureaucracy বইগুলো বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের সমাজ এবং প্রশাসনের বিবর্তন জানতে রেফারেন্স হিসেবে কাজ করছে।
ড. আকবর আলি খানকে নিয়ে অনেকে বিদগ্ধজন অনেক কিছু লিখবেন। আমার জন্মস্থান ও নিজ জেলা হবিগঞ্জের সাথে আকবর আলি খানের নাম জড়িয়ে আছে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ও্ হবিগঞ্জ থাকবে আকবর আলি খানকে সেখান থেকে বিচ্ছন্ন করা যাবে না। আকবর আলি খান ও হবিগঞ্জ নিয়ে কয়েক লাইন লিখছি। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেয়ার পর ১৯৭০ সালে আমাদের হবিগঞ্জ মহুকুমার এসডিও বা মহুকুমা প্রশাসক হিসেবে যোগ দেন। এটিই তাঁর মাঠ প্রশাসনে প্রথম পদায়ন। হবিগঞ্জে যোগ দিয়েই তাঁর প্রথম চ্যালেঞ্জই ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচন পরিচালনা। সুষ্ঠুভাবে সেই নির্বাচন পরিচালনা করেন। বাঙালির অসহযোগ আন্দোলনে তাঁর সমর্থনই ছিল না; জনমতও গঠন করেন। পাকিস্তান আমলে একজন এসডিওর অসহযোগ আন্দোলনে সায় দেয়া সহজ ব্যাপার ছিল না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্রাগার খুলে দেন। সেই অস্ত্র দিয়েই হবিগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী বাহিনীকে প্রথম প্রতিহত করে। মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীন বাংলাদেশের তহবিল গঠনে সরকারি ট্রেজারী থেকে তৎসময়ের ৩ কোটি টাকা ট্রাকে তুলে দিয়ে আগরতলা পৌঁছে দেন। সেই অর্থ দিয়েই বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রথম অস্ত্র কেনা হয়। তিনি খাদ্য গুদাম উন্মুক্ত করে তা মুক্তিযোদ্ধা ও বাঙালিদের জন্য বিলিয়ে দেন। আর এতদসংক্রান্ত আদেশ তিনি নিজ হাতে লিখেছিলেন। যা এখনও হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসনে দলিল হিসেবে থাকার কথা। পরে তিনি যোগ দেন মুজিবনগর সরকারে। মুক্তিযুদ্ধকালীন এসব ভূমিকার জন্য পাকিস্তান সরকার প্রশাসনিক অসদাচরনের অভিযোগে তাঁর অনুপস্থিতে বিচার কাজ সম্পন্ন করে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেয় ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে। আর এই দন্ডাদেশ মাথায় নিয়েই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার তথা মুজিবনগর সরকারে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
হবিগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কিত অনেক লেখাতেই আকবর আলি খান প্রসঙ্গ আসে। হবিগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো বিতর্ক তথা মুক্তিযুদ্ধে কার ভূমিকা কী ছিল এসব প্রসঙ্গ আসলে উপসংহার আসতো, “চলেন আকবর আলি খান স্যারকে জিজ্ঞেস করি” এ বাক্যের মাধ্যমে। হবিগঞ্জের পার্শ্ববর্তী জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান হলেও চিরদিন হবিগঞ্জের মাটি ও মানুষের সাথে মিশে আছেন ও থাকবেন ড. আকবর আলি খান। তাঁর সর্বশেষ গ্রন্থ "পুরনো সেই দিনের কথা" (ফেব্রুয়ারী ২০২২) এর দশম অধ্যায়ে "হবিগঞ্জে মহকুমা প্রশাসক" এবং "মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের সাফল্য" শিরোনামীয় লেখাটিতে হবিগঞ্জে তাঁর কর্মজীবনের স্মৃতিচারন করেছেন। অন্ততঃ তিনটি অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকারের কর্মকাণ্ড বর্ণনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের বস্তনিষ্ঠ ইতিহাস জানতে এটি একটি অনন্য গ্রন্থ।
হবিগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক মাহমুদ হাসানের কাছ থেকেও আকবর আলি খান সম্পর্কে অনেক জেনেছি। জেলা প্রশাসক মাহমুদ হাসান হবিগঞ্জে কোনো একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বাপা-বেন-সাস্ট কনভেনশনে দীর্ঘ সময় উনারা আলাপও করেছিলেন। সেই কনকনে শীতে ঘন কুয়াশা ভেদ করে ভোরে হবিগঞ্জ থেকে ডিসি মাহমুদ হাসান কনভেনশন নয়; যেন তাঁর অগ্রজ আকবর আলি খানের সাথে আলাপ করার জন্য সিলেট এসেছিলেন। বিদায় নেয়ার সময় আমাকে বলে গেলেন, শাকিল সাহেব আকবর আলি খান স্যারকে হবিগঞ্জ নিয়ে আসবো। অনেক কাজ করতে হবে। আমরা কয়েকদিন বসেও ছিলাম। পরে আমি ঐ বছরেই লন্ডন চলে যাই উচ্চ শিক্ষার্থে। শারিরীক সমস্যা (বা অন্য কোনো কারনে) তাঁর আর হবিগঞ্জে যাওয়া হয়নি সে সময়। আকবর আলি খানের মৃত্যুতে সারাদেশের ন্যায় হবিগঞ্জবাসীও শোকাহত। হবিগঞ্জ যেন তাঁর মাটির সন্তানকে হারালো। আমি তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আকবর আলি খানের সৃষ্টি আমাদের পথ দেখাবে।
ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক শাকিল, অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)র আজীবন সদস্য।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/প্রেবি/এসডি-২০




