“সঙ্গীত আমার প্রাণ। সঙ্গীত আমার সাধনা। সঙ্গীত আমার জীবন-মৃত্যু। সঙ্গীতকে ভালোবাসি হৃদয় দিয়ে। সঙ্গীতের ছায়ায় থাকলে তৃপ্ত হই। ভালোলাগা ও ভালোবাসার জন্য সঙ্গীত জগতে ৩০ বছর ধরে পড়ে আছি। যতদিন বাঁচবো ততদিন সঙ্গীতেই ডুবে থাকবো। ভালোবাসার এই সুন্দর মায়াবি সঙ্গীত ভুবন ছেড়ে অন্য কোথাও যাবো না। সঙ্গীত নিয়েই আমার আজন্ম বসবাস। আমি সঙ্গীতের ক্রীতদাস। সঙ্গীতে যেন আমৃত্যু থাকতে পারি- সেটিই প্রত্যাশা করি।”
কথাগুলো বললেন ‘ক্ষ্যাপার দল’ ব্যান্ড-এর সুমন কল্যাণ। সুরের মানুষ, প্রাণের মানুষ সুমন কল্যাণ একাধারে গীতিকবি, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পী।
সঙ্গীত জগতের সকল শাখাতেই রয়েছে তাঁর অবাধ বিচরণ। সঙ্গীত নিয়েই তাঁর সময় কাটে। তিনি সঙ্গীতকে জীবনের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নিয়েছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সুরের রঙে রঙিন প্রজাপ্রতি হয়ে কাজ করেন শ্রোতাদের জন্য। অগণিত মানুষের ভালোবাসা পাবার আশায় তাঁর পথচলা। বাংলা গানের মহাসর্বনাশ করে কোটি কোটি ভিউ আর সস্তা জনপ্রিয়তা চান না সুমন কল্যাণ। সুমন কল্যাণ করতে চান সঙ্গীতের সৃজনশীল মৌলিক কাজ। যে কাজ ত্রিভুবনে অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকবে মানুষের অন্তরে। মানুষ হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসায় রাখবে সকল প্রহরে।
খুব ছোট বেলায় ‘ক্ষ্যাপার দল’ ব্যান্ড-এর প্রধান গায়ক সুমন কল্যাণ সঙ্গীতে হাতেখড়ি নেন। সঙ্গীত শিক্ষক কাজল দাদার কাছে নেন প্রথম তালিম। ‘সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি, সা’ শেখার পর উস্তাদ কায়ছার মো. ইসলাম-এর কাছে ওয়েস্টার্ন মিউজিক শেখেন দীর্ঘদিন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীতকে রপ্ত করে নেন হৃদয়ের মাঝে। দু’চোখে স্বপ্ন দেখেন একদিন সঙ্গীত নিয়েই কিছু একটা করবেন। সঙ্গীতকে সঙ্গী করেই মানবজীবন কাটিয়ে দেবেন সুরের সাধনায়। এখন সেই স্বপ্নের সারথী হয়ে চলছেন সুমন কল্যাণ। সুরের মানবিকতা সাধনা করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
প্রায় শতাধিক গানের সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন গুণী এ শিল্পী। দেশবরেণ্য অনেক সঙ্গীতশিল্পীর জন্য সুর করেছেন, করেছেন তাঁদের গানের সঙ্গীত পরিচালনা। একজন বাদক হিসেবেও তাঁর সুখ্যাতি রয়েছে। সময় পেলেই গিটার কিংবা কি-বোর্ড হাতে নিয়ে সুরের খেলায় মেতে ওঠেন। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে গানের সুর এবং সঙ্গীত পরিচালনায় নেমে পড়েন। সৃষ্টি করেন নতুন চেতনায় নতুন ধারার ভিন্ন গান। সে গান শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। শ্রোতাদের চাহিদাকে সামনে রেখে সুমন কল্যাণ কাজ করেন বলে তিনি জানালেন।
তিনি বলেন, সঙ্গীত সাধনার বিষয়। সঙ্গীত হলো গুরুমুখি বিদ্যা। সুতরাং সঙ্গীতকে ভালোবেসে এগিয়ে যেতে হবে। তবেই স্বপ্ন পূরণ হয়।
‘ক্ষ্যাপার দল’ ব্যান্ড-এর শুভযাত্রা হয়েছিল ২০০০ সালে বাণিজ্য নগর চট্টগ্রামে। ২০০২ সাল পর্যন্ত পুরো চট্টগ্রাম মাতিয়ে রেখেছিল ‘ক্ষ্যাপার দল’ ব্যান্ড। তারপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে এবার ২০২২ সালে আবারো ‘ক্ষ্যাপার দল’ ব্যান্ড ৪টি নতুন গান নিয়ে শ্রোতার মনে বেশ আলোড়ন তুলেছে। এসব গানের মাধ্যমে রাজবেশে ফিরে আসে সবার প্রিয় ব্যান্ড ‘ক্ষ্যাপার দল।’ ব্যান্ডটি পরপর নতুন ৪টি গান প্রকাশ করে।
প্রকাশিত গানগুলো হল- ‘আহারে শহরে’, ‘কেন কে জানে’, ‘জানি একদিন’ ও ‘দাম বাড়েনি মানুষের’। দেশের গুণী গীতিকবিদের লেখা এসব প্রকাশিত গান বাংলার মানুষের মনে-প্রাণে সৃজনশীলতার ঝড় তুলেছে। বলা যায়- দেশের শ্রোতাদের ভালো লেগেছে। সবার মন জয় করেছে। বর্তমানে ‘ক্ষ্যাপার দল’ ব্যান্ডটি নিয়মিতভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে শো করছে। শো করছে দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে। পাশাপাশি তারা অনুশীলনও চালিয়ে যাচ্ছে।
সুমন কল্যাণ বলেন, সঙ্গীতে ভালো কিছু করতে হলে অনুশীলনের বিকল্প নেই। অনুশীলন চালাতে হবে নিয়মিত। অনুশীলন করলে শ্রোতাদের ভালো কিছু উপহার দেয়া অসম্ভব কিছু নয়। ‘ক্ষ্যাপার দল’ ব্যান্ড নতুন নতুন আরও কিছু গান প্রকাশের জন্য বিরামহীন কাজ করে চলেছে। পুরোদমে সুরের প্লাবনে ব্যস্ততার মাঝেই এগিয়ে যাচ্ছে ‘ক্ষ্যাপার দল।’ ‘ক্ষ্যাপার দল’ ব্যান্ডটির বর্তমান লাইনআপ হলো- কি-বোর্ড ও প্রধান ভোকাল: সুমন কল্যাণ, লিড গিটার: রাজীব ঘোষ, ড্রামস ও ভয়েস: মান্নান সোহেল ও বেস-গিটার: মো. দানেস।
‘ক্ষ্যাপার দল’ ব্যান্ডটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে এই ০১৭১২-১০১৬০৭ মোবাইল নাম্বারে এবং ই-মেইল [email protected]এ যোগাযোগ করলেই হবে।
জননন্দিত সঙ্গীতজ্ঞ সুমন কল্যাণ এ পর্যন্ত ৩টি অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন। ২০১২ সালে ‘নাগরিক আকাশ’, ২০১৪ সালে ‘গানের ক্রীতদাস’ ও ২০১৬ সালে ‘সুইসাইড নোট।’ প্রকাশিত ৩টি অ্যালবামই বাংলা গানের শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। সে-সময় শ্রোতারা লুফে নিয়েছেন সুমন কল্যাণ-এর প্রকাশিত গানগুলি। শ্রোতারা তখন অন্তর থেকেই গানগুলো পছন্দ করেছিলেন। আজও সেসব শৈল্পিক গান মানুষ গুনগুনিয়ে গায়। গানগুলো বাজে মঞ্চে ও টিভিতে। সুমন কল্যাণ-এর পরিবার ছিল সঙ্গীতের পরিবার। পরিবারে সঙ্গীত সাধনা থাকায় সুমনকে সঙ্গীতচর্চায় বেগ পেতে হয়নি। কোনো বাধা আসেনি তাঁর জীবনে। ১৯৯০ সালে চট্টগ্রামে সঙ্গীতের পেশাগত জীবন শুরু করেন সুমন কল্যাণ। প্রথমে ‘সিটি বয়েজ’ ব্যান্ড দিয়ে সঙ্গীত জীবনের যাত্রা শুরু করেছিলেন। তারপর থেকে সুমন কল্যাণকে আর পেছন দিকে তাকাতে হয়নি। এখন পর্যন্ত দীপ্ত আলোয় সঙ্গীতের অমিয় অমৃত সুধায় ছুটে চলছেন তিনি। বীর মুক্তিযোদ্ধা পিতা বেণী লাল দাস গুপ্ত ও মমতাময়ী প্রয়াত মাতা নমিতা দাস গুপ্ত’র ঘর-সংসার আলোকিত করে সুমন কল্যাণ চট্টগ্রামের নন্দনকাননে ১২ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাতার একমাত্র সন্তান, সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব সুমন কল্যাণ-এর মমতাময়ী মাতা নমিতা দাস ২০০৯ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন। সেই থেকে মা হারানোর ব্যথায় আজো তাঁর চোখে অশ্রুজল বয়ে যায়। মায়ের প্রতি তার ভালোবাসা অবিরাম রয়েছে।
বসন্তকাল অর্থাৎ বসন্ত ঋতু বেশ ভালো লাগে এই সুর সাগরের মাঝি সুমন কল্যাণ-এর। গায়ক অঞ্জন দত্ত ও জেমস তার প্রিয় শিল্পীর তালিকায় রয়েছে সবার শীর্ষে। এলআরবি ব্যান্ড-এর প্রয়াত গায়ক আইয়ুব বাচ্চুর গান তাঁর ভীষণ প্রিয় এবং রেনেসাঁ ব্যান্ড-এর গানও তার প্রিয় তালিকায় রয়েছে। সুর সাগরের মাঝি সুমন কল্যাণ ২০১১ সালে সংসার জীবনের ইনিংস শুরু করেন চিত্রপট শিল্পী সেতু বৈশ্যকে সঙ্গী করে। এক ছেলে দিব্য ও এক মেয়ে গান বুড়িকে নিয়ে সঙ্গীত নৌকার সারথী সুমন কল্যাণ মায়াময় সঙ্গীতের মাদকতায় রংধনু রঙে চলছেন। সুমন কল্যাণ সময় পেলেই গুণী লেখকদের নান্দনিক ও রুচিশীল বই পড়েন। বইপড়া তাঁর একটি অভ্যাস।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/এসজি/এসডি-১৬




