সম্প্রতি সিলেট বিভাগজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা ঘটলেই সড়কে ঝরছে এক বা একাধিক প্রাণ। খালি হচ্ছে কোনো মায়ের কোল, স্বামীহারা হচ্ছেন কোনো স্ত্রী, অথবা পিতা-মাতা হারাচ্ছে সন্তানেরা। রাত কি দিন- সিলেটের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে চলছে মৃত্যুর বিভীষিকা।
এছাড়াও প্রাণহানির পাশাপাশি অনেকেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হারিয়ে সারাজীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন দুর্ঘটনার ক্ষত। গত মাত্র ৭ দিনে সিলেট বিভাগে সড়কে ঘটেছে অন্তত: এক ডজন দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে আটজনের।
এ ক্ষেত্রে চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালনা ও অদক্ষতাকেই দায়ী করছে পুলিশ। তবে সচেতন মানুষের বক্তব্য- যানবাহনের বেপরোয়া গতি, অপ্রশস্ত রাস্তা আর ট্রাফিক আইন অমান্য করাই সিলেটে সড়কে দুর্ঘটনার কারণ। দুর্ঘটনা এড়াতে সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক দ্রুত চার লেনে রূপান্তরসহ হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২০) সন্ধ্যায় সিলেটের গোলাপগঞ্জে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেল আরোহী সড়কে পড়ে গেলে অজ্ঞাত গাড়ি তাকে চাপা দিয়ে চলে যায় অথবা তিনি কোনোকিছুর সঙ্গে প্রচন্ড জোরে ধাক্কা থান। এতে বীভৎসভাবে শরীরের প্রায় অর্ধেক থেতলে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে ওই মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়।
নিহতের নাম নাজিম উদ্দিন (৫২)। তিনি সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার কসকনকপুর ইউনিয়নের মুন্সিপাড়া এলাকার মামুরাখানি গ্রামের আবদুল হাইয়ের ছেলে। তিনি ওমান প্রবাসী ছিলেন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সড়কের পাশে এক ব্যক্তির থেঁতলানো মরদেহ দেখতে পেয়ে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই লাশ ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করে। তবে তিনি কীভাবে মারা গেছেন, কিংবা কোন গাড়ির ধাক্কায় এ ঘটনা ঘটেছে, সেটি কেউ দেখেননি।
ধারণা করা হয়- নিহত ব্যক্তি ভারী কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লেগে মারা গেছেন। মোটরসাইকেলটি অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। হয়তো মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়ার পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়েছিলেন। এ জন্য মোটরসাইকেলটি অক্ষত থেকে যায়।
একইদ দিন অর্থাৎ- বৃহস্পতিবার সিলেটের ওসমানীনগরে হাইওয়ে পুলিশের ধাওয়ায় ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে এক টমটম চালক নিহত হয়েছেন। ওইদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের উপজেলার ব্রাম্মণগ্রাম (এওলাতৈল) নামক স্থানে ঘটনাটি ঘটে। নিহত টমটম চালক নূর মিয়া উপজেলার গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের গদিয়াচর গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার দুপুরে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল সিলেট ঢাকা মহাসড়কের উপজেলার গোয়ালাবাজার এলাকায় একটি ব্যাটারি চালিত টমটমকে আটকের জন্য ধাওয়া দিলে অপরদিক দিক থেকে একটি ট্রাক এসে টমটমকে চাপা দেয়। এসময় ঘটনাস্থলে টমটম চালক নূর মিয়া নিহত হন।
তবে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্য পরিমল চন্দ্র দেব বলেন, শেরপুর পুলিশ ফাঁড়ির গাড়ি পুলিশ সদস্যদের নিয়ে টহলে ছিলো। গোয়ালাবাজার থেকে আসার পথে একটি ট্রাক একটি টমটমকে চাপা দেয়। পুলিশ সদস্যরা দুর্ঘটনা দেখে ঘটনাস্থলে যান এবং উদ্ধার কাজে নিয়োজিত হন। কিন্তু সাধারণ জনতা ভুল বুঝে পুলিশের উপর দায় চাপানোর চেষ্ট করে। পরে বিষয়টি তারা বুঝতে পারেন। ওই ট্রাক জব্ধ এবং চালককে আটক করে পুলিশ।
এর একদিন আগে- ১৮ অক্টোবর সিলেটের জৈন্তাপুর সড়ক দুর্ঘটনায় ডিআই ট্রাক চালক নিহত হন। ওইদিন সকাল ৫টায় সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের দরবস্ত ইউনিয়নের পাকড়ী এলাকায় রাস্তার পাশে বন্ধ রাখা ট্রাকের পিছনে বেপরোয়া গতির ডিআই ট্রাক ধাক্কা দিলে দুর্ঘটনার স্বীকার হয়। এই ঘটনায় ডি.আই ট্রাক চালক গোয়াইনঘাট উপজেলার লামাকোটাপাড়া গ্রামের মো. হারিছ আলীর ছেলে মো. বদরুল ইসলাম (২৪) নিহত হন। এলাকাবাসী দ্রুত এগিয়ে গিয়ে নিহত ডিআই ট্রাক চালককে উদ্ধার করেন সিলেট এমএজি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার থাকে মৃত ঘোষনা করে।
গত ১৭ অক্টোবর সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে মোটিরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে পঞ্চাশোর্ধ রহিমা বেগমের মৃত্যু হয়। ওই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার দোয়ারাবাজার-বাংলাবাজার ব্রিটিশ সড়কের বিচঙ্গেরগাঁও মসজিদের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত রহিমা বেগম উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের ঝুঁমগাঁও খাসিয়াবাড়ি গ্রামের উসমান আলীর স্ত্রী।
পুলিশ জানায়, অসুস্থ রহিমা বেগম চিকিৎসা শেষে সোমবার রাতে দোয়ারাবাজার থেকে তার ছেলের মোটরসাইকেলে চড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে বিচঙ্গেরগাঁও মসজিদের সামনে আসামাত্র রাস্তার উপর আইল্যান্ডের সাথে ঝাঁকুনি খেয়ে রহিমা বেগম ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে দোয়ারাবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
১৬ অক্টোবর সিলেটের ওসমানীনগরে যাত্রীবাহী মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে দুজন নিহত হন। ওইদিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ওসমানীনগর উপজেলার গোয়ালাবাজার এলাকার খলারায় নিরাইয়ার ব্রিজে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন- সিলেটের বিয়ানীবাজারের একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর হরিপুর গ্রামের সৈয়দ আবুল মোবারকের ছেলে সৈয়দ লুৎফুর রহমান (৩৫) এবং মাইক্রোবাসের চালক মারজান হোসেন (৩০)। মারজানের বাড়ি সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ থানাধীন অনন্তপুর গ্রামে। তিনি দক্ষিণ সুরমার চন্ডিপুল মাইক্রোবাস উপ-কমিটির সদস্য ছিলেন।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, সিলেটগামী দ্রুতগামী মাইক্রোবাসটি গোয়ালাবাজার খলারায় এলাকায় নিরাইয়া সেতুর ওপর ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। এসময় এসময় ঘটনাস্থলেই মাইক্রোবাসচালক ও ব্যাংক কর্মকর্তা মারা যান। পরে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে গিয়ে হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে পুলিশকে খবর দেন।
এ দুর্ঘটনায় আরও তিন-চারজন আহত হন। পরে তাঁদের হাসপাতালে পাঠানো হয়।
গত ১৪ অক্টোবর সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে একই পরিবারের চাচা-ভাতিজি নিহত হয়েছেন। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টায় সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পূর্ব পাগলার নোয়াগাঁও গ্রামের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন- রূপা বেগম (১০) ও টিপু মিয়া (৩৫)। টিপু দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামের আঞ্জব আলীর ছেলে এবং রূপা টিপুর ভাই শমশের আলীর মেয়ে। এ দুর্ঘটনায় আরো ৪জন আহত হন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সিলেট থেকে দিরাইমুখী শুভযাত্রা পরিবহণ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস (চট্ট-মেট্রো জ- ১১-০৫৪৮) দামোধরতপী এলাকার নোয়াগাঁও গ্রামে স্থানীয় মেম্বার মো. আনোয়ার হোসেনের বাড়ির সামনে এলে সড়কের খানাখন্দ এড়াতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই টিপু মিয়া ও রুপা বেগমের মৃত্যু হয়।
এসময় আরো ৪-৫ জন গুরুতর আহত হন। প্রথমে স্থানীয়রা ও পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন হতাহতদের উদ্ধার করেন।
এ বিষয়ে ভোক্তভুগী ও বিশ্লেষকরা বলছেন- সড়কে বিপজ্জনক বাঁক, রোড মার্কিংয়ের অভাব, ফিডার রোড (পার্শ্ব রাস্তা) এবং সড়কে অটোরিকশার দাপটে মহাসড়কে দুর্ঘটনা বাড়ার মূল কারণ। এ চারটির পাশাপাশি ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গাড়ি চালানো, অতিদ্রুত বা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, গতিসীমা অনুসরণ না করা, মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল বহন করা, রোড সাইন, মার্কিং ও ট্রাফিক সিগন্যাল সম্পর্কে ধারণা না থাকা বা ধারণা থাকলেও তা মেনে না চলা, ওভারটেক, সামনের গাড়ির সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রাখা, ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চালানো, চালকের পরিবর্তে হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে গাড়ি চালানো, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম না নিয়ে অবসাদগ্রস্ত অবস্থায় একটানা গাড়ি চালানো, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, শিক্ষার স্বল্পতা, অপর্যাপ্ত ট্রেনিং ও অনভিজ্ঞতাও দুর্ঘটনার কারণ।
এছাড়াও চালকদের মাদকগ্রহণের প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে বলে মনে করেন সচেতন মহল। তাদের বক্তব্য- চালকদের বেশিরভাগই মাদকাসক্ত। আর বর্তমানে এই হার আরও বেড়েছে। একারণে সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণও বাড়ছে। এবিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর হতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও দুর্ঘটনা রোধে করণীয় বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশ সিলেট রিজিওনের এসপি (পুলিশ সুপার) মো. শহীদ উল্লাহ শুক্রবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সিলেটভিউ-কে বলেন, উঠতি বয়েসি ছেলেরা রাস্তায় মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়। তাদের থাকে না লাইসেন্স। সঙ্গে থাকে না হেলমেট। রাস্তায় গতির প্রতিযোগিতা করে। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে। অনেকেই মারা যান এমন দুর্ঘটনায়। রাস্তায় এমন বেপরোয়া মোটরসাইকেল দেখলে আমরা চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেই।
তিনি আরও বলেন, মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ত্রি-হুইলার চলাচলের অনুমতি নেই। তবুও এসব গাড়ি মহাড়সকে চলে। এদের যানবাহন চালানোর লাইসেন্স নেই। পুলিশ দেখলেই গাড়ির গতি বেপরোয়াভাবে বাড়িয়ে পালিয়ে যেতে চায়। লাইসেন্সবিহীন এসব অদক্ষ ড্রাইভারদের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। তবে আমরা তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দেই। আবার এসব অদক্ষ ড্রাইভারদের কারণে কারো মৃত্যু হলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করি।
হাইওয়ের এই পুলিশ সুপার বলেন, ট্রাফিক নিয়ম অনুযায়ী মহাসড়কে সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার। কিন্তু সেটি অনেকেই মানে না। বিশেষ করে কমবয়েসি মোটরসাইকেল চালকরা। আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আছি, আরও কঠোর হবো।
এসপি শহিদুল্লাহ আরও বলেন- অনেক সময় পথচারীদের ভুলের কারণেও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। যে যেভাবে পারছে সড়ক পার হচ্ছে। আমরা সচেতনতা বৃদ্ধি করতে কাজ করছি। বিভিন্ন সময় সভা-সেমিনার করছি। চালক ও হেলপারদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। তবে সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে এবং কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম




