বাংলায় একটি প্রবাদ প্রবচন আছে, ঝি জব্দ কিলে, বৌ জব্দ শিলে, পাড়াপড়শী জব্দ চোখে আঙুল দিলে। আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন ও ব্যবহারে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই শিলপাটা। স্থানীয়ভাবে এটা ‘পাটা-পুতাইল’ নামে পরিচিত। একসময় মসলা বাটার একমাত্র সহজ উপায় ছিলো শিল-পাটা। গ্রামীণ সমাজের প্রত্যেক ঘরে ঘরে শিল-পাটা ছিল রান্নার মসলা বাটার অন্যতম পাথেয়। 

 



বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে হলুদ বাটো মেন্দি বাটো/বাটো ফুলের মউ,/বিয়ের সাঁজন সাঁজবে কন্যা... এইসব গীত গাওয়ার মাধ্যমে গ্রামের সকল শ্রেণী-পেশার মহিলারা বিয়ে বাড়িতে দু‘তিন দিন আগে থেকে হলুদ-মেন্দি বাটতেন। তাছাড়া সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভোজনবিলাসী গৃহিণীরা হরেক রকম স্বাদের মসলা বাটা করে দিতেন। কিন্তু কালের আবর্তে ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক, বাঙালীর সমাজ ব্যবস্থার পারিবারিক অঙ্গন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শিল-পাটার ব্যবহার।

 

 


সিলেটের প্রকৃতি কন্যা জাফলং যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর তেমনি এখানে রয়েছে খনিজসম্পদ পাথরেরও ভাণ্ডার। সেই পাথর কেটে রান্নায় রসদ জোগানো বিভিন্ন মসলা মিহি বা গুঁড়া করার জন্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কারিগররা তৈরি করা হয় 'শিল-পাটা'। একসময় দেশের প্রত্যেকটি পরিবারে এ শিলপাটার ব্যবহার ছিল ব্যাপকভাবে। কয়েকবছর আগেও জাফলং থেকে প্রচুর পাথর উত্তোলন হতো। কিন্তু এখন জাফলং থেকে পাথর উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ। তাই এই ব্যবসার সাথে জড়িতরা কষ্টে দিন পার করছেন। তার মধ্যে ভরত থেকে ম্যাশিনে কাটা শিলপাটা দখল করেছে বাজার। কালের বিবর্তন ও আধুনিক প্রযুক্তির আশীর্বাদে ক্রমেই মানুষ হয়ে উঠেছে যন্ত্রমুখী। এ যুগে বিভিন্ন মেশিনের সাহায্যে সব ধরনের মসলা ভাঙানো বা গুঁড়া করা হয়, সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে কমতে থাকে শিলপাটার ব্যবহার। প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়া শিলপাটার ব্যবহার এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। তবে মেশিন দিয়ে ভাঙানো পণ্যের চেয়ে পাটা দিয়ে তৈরি মসলার খাবার অনেক সুস্বাদু বলে অনেকেই মনে করেন।

 

 


সিলেটের চাঁদনীঘাট এলাকায় এখনো কিছু শিলপাটার দোকান টিকে আছে। এখানে কারিগরদের নিপুণ কারিগরির মাধ্যমে তৈরি হয় আদি যুগের মসলা তৈরির যন্ত্র শিল-পাটা। শিল-পাটা তৈরির সময় সেগুলোতে ফুটিয়ে তোলা হয় নানা ধরনের নকশা। পর্যটন সিলেটের এসব শিল-পাটা বিক্রির জন্য পরে চলে যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। প্রতিটি শিলপাটা দাম পরে পাঁচশত টাকা থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত।

 

 


শিলপাটার সাথে জড়িতরা বলেছেন, আগে দেশের প্রত্যেকটি গ্রামের প্রত্যেক পরিবারেই পাটার ব্যবহার ছিল; কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন আর পাটা আগের মতো চলে না। এছাড়া আগে জাফলং থেকে প্রচুর পাথর পাওয়া যেতো, কিন্তু এখন পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় ভারতের ম্যাশিনে কাটা শিল-পাটা বাজার দখল করে নিয়েছে। তবে সিলেটের শিল-পাটার মতো টেকসই না। 

 


শিল-পাটার ব্যবহার হ্রাস পাওয়ায় অনেক কারিগর পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু অনেক কারিগর উপার্জন কমে যাওয়ার পরেও অনেক বাধা-কষ্ট পেরিয়ে বাপ-দাদার ঐতিহ্য ওই পেশাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। তবে প্রাচীন এই শিলপাটা শিল্পকে রক্ষায় সচেতন মহলকে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় হারিয়ে যাবে পারিবারিক ভাবে ব্যবহৃত প্রাচীন এই শিল-পাটা।

 

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/নাজাত/মুন্না-৪